গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের নিরঙ্কুশ জয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে সাংবিধানিক পরিবর্তন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। এতে দেশের শাসনব্যবস্থা ও সাংবিধানিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের পথ খুলে গেল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই গণভোটের ফলাফলের মধ্য দিয়ে সংসদীয় কাঠামো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মৌলিক সংস্কার কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রায় আসায় জাতীয় সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে। সংসদের নিম্নকক্ষের পাশাপাশি দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন বাধ্যতামূলক থাকবে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদকে দুটি পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শপথ গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ দিন সংসদ সদস্যরা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবেন। এরপর তারা নিয়মিত আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধান সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা নতুনভাবে গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন বিধানে অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিলে সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন। সংবিধানের মূলনীতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে নতুন মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি। একই সঙ্গে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত হবে।
বর্তমানে সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০টি থাকলেও জুলাই সনদে তা ধাপে ধাপে ১০০তে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদও নির্দিষ্ট করা হচ্ছে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা জারির জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং ওই বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক থাকবে। জরুরি অবস্থার সময় মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। গোপন ব্যালটে সংসদের উভয়কক্ষের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রেও নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ—উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে। অপরাধীকে ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল, পিএসসি ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। আপিল বিভাগ থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, বিচারকসংখ্যা নির্ধারণে প্রধান বিচারপতির মতামত গ্রহণ, হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগে কমিশন গঠন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নাগরিক পরিচয় হিসেবে ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা বহাল থাকলেও অন্যান্য মাতৃভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত হচ্ছে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের বিস্তারিত প্রক্রিয়াও জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে জুলাই সনদের কয়েকটি ধারায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। বিশেষ করে সরকারপ্রধান ও দলপ্রধান আলাদা রাখার বিধান এবং কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দলটির আপত্তি রয়েছে। এসব বিষয় গণভোটের মাধ্যমে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট পেয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ইতিহাসে এটি চতুর্থ গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই গণভোটকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।