গণভোটের রায়ের পর আলোচনায় সংসদের উচ্চকক্ষ, আসন বণ্টনে এখনো ধোঁয়াশা
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে বিজয়ের পর জাতীয় সংসদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তীব্র হয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে নির্বাচিত সব রাজনৈতিক দল একমত হলেও, কোন পদ্ধতিতে আসন বণ্টন হবে-সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গণভোটের প্রশ্নপত্র অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের কথা বলা হয়েছে। তবে সরকার গঠন করতে যাওয়া দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ ছিল-সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। এ বিষয়ে বিএনপি প্রকাশ্যে এখনো কোনো অবস্থান জানায়নি। দলীয় সূত্র বলছে, ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পক্ষেই তারা আগ্রহী।
তবে সংবিধান ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে গণভোটের রায়ই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। কারণ জনগণ সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে এ বিষয়ে মত দিয়েছে।
দুই পদ্ধতিতে আসন বণ্টনের হিসাব গণভোটের রায় অনুযায়ী প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের ১০০টি আসন বণ্টন হলে বিএনপি পেতে পারে ৪৮টি এবং জামায়াতে ইসলামী ৩৩টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ১১ দলীয় জোটের শরিকরা পেতে পারে মোট ৯টি আসন।
অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে হিসাব করলে চিত্র ভিন্ন হয়। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়েছে। সে হিসাবে উচ্চকক্ষে দলটির প্রাপ্য দাঁড়ায় ৬৯টি আসন। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পাওয়ায় তাদের প্রাপ্য হবে ২২টি আসন। এনসিপি পাবে ২টি এবং অন্যান্য দল পাবে মোট ৭টি আসন।
গণভোটের রায় মানতে বাধ্য কি রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের রায়ের বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (জুলাই সনদসংক্রান্ত) মনির হায়দার বলেন, রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে অনেক বিষয় থাকে, তবে গণভোটে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার আইনগত ভিত্তি রয়েছে।
তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফলে এটি কেবল সরকারের নয়, রাষ্ট্র ও সব রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত এজেন্ডা।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়েই সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা জুলাই সনদে উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার জন্য আলাদা কোনো যোগ্যতার কথা বলা হয়নি। নিম্নকক্ষের সদস্যদের জন্য সংবিধানে যে যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধান রয়েছে, তা উচ্চকক্ষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
সে অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স, ঋণখেলাপি না হওয়া এবং ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত না হলে কেউ উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নেই সদস্য নির্বাচিত হবেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরাও উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন।
উচ্চকক্ষের ক্ষমতা ও দায়িত্ব গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রপতির অভিসংশনের ক্ষেত্রে লাগবে উচ্চকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি।
উচ্চকক্ষ সরকারকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারবে। তবে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে কিংবা সাধারণ বিলে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা তাদের থাকবে না।
কবে গঠন হবে উচ্চকক্ষ জুলাই আদেশ অনুযায়ী নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর প্রথম ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবেন। এ সময় জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করার কথা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের শপথ ১৬ ফেব্রুয়ারি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, বাস্তবতা বিবেচনায় আগামী আট মাসের আগে উচ্চকক্ষ গঠনের সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।