বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ‘লাল তালিকায়’ রয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির একটি চিত্র প্রকাশ করলেও দেশের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে, যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক পাঁচ মাস ধরে তা আবার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও চাপ কম নয়; ফেব্রুয়ারিতে এ খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়ে। অনেক ক্ষেত্রে মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত খাবারের পেছনে চলে যায়। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তা তাদের জীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। সহজভাবে বলতে গেলে, এক বছর আগে যে পরিমাণ খাদ্য কিনতে ১০০ টাকা খরচ হতো, এখন একই পরিমাণ কিনতে ব্যয় হচ্ছে ১০৯ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৯ টাকা ৩০ পয়সা। এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে অনেক পরিবারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ খাদ্যতালিকা কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি অনেকটা অদৃশ্য করের মতো কাজ করে। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বেড়ে গেলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বজায় থাকলে তা দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা অতীতে খুব বেশি দেখা যায়নি। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘বেগুনি’ শ্রেণি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ‘লাল’ শ্রেণি উচ্চ ঝুঁকির নির্দেশক। বর্তমানে বাংলাদেশ এই লাল তালিকায় অবস্থান করছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা নির্দেশ করে। একই সময়ে বিশ্বের কয়েকটি দেশ আরও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। মালাউই টানা নয় মাস ধরে বেগুনি শ্রেণিতে রয়েছে। এছাড়া ইরান ও জাম্বিয়া আট মাস এবং তুরস্ক ও আর্জেন্টিনা সাত মাস ধরে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে কিছু দেশ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অবস্থানে যেতে পেরেছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি শুধু অর্থনৈতিক একটি সূচক নয়, বরং এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষকে ক্রমেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।