পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলোচনা সত্ত্বেও উভয় পক্ষ অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বৈঠক শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তান ত্যাগ করেন। ফলে আলোচনার এই ধাপ কার্যত স্থগিত হয়ে পড়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে। রোববার (১২ এপ্রিল) ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম সংবাদ সংস্থা এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রায় ২১ ঘণ্টাব্যাপী টানা বৈঠক ও বিভিন্ন পর্যায়ের পরামর্শ শেষে আলোচনা শেষ হলেও কোনো যৌথ কাঠামো বা সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ইরানি সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত’ এবং ‘বাস্তবতাবর্জিত’ দাবির কারণেই এই আলোচনা ভেস্তে গেছে। বৈঠকে ইরানের প্রতিনিধি দলে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আলি বাকেরি অংশ নেন। তারা আলোচনায় দেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত অধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানি পক্ষ থেকে অভিযোগ করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছে, যা তারা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ইরানের ভেতর থেকে পারমাণবিক উপাদান অপসারণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের পক্ষ থেকে একাধিক প্রস্তাব উপস্থাপন করে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথ তৈরি করার চেষ্টা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ও উচ্চাভিলাষী অবস্থানের কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। ইরানি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের দাবি বাস্তবতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেছেন—ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করা এবং ভবিষ্যতেও সে ধরনের সক্ষমতা অর্জনের পথ থেকে সরে আসার বিষয়ে স্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার দিতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি নির্দিষ্ট করে কোন কোন শর্ত ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি হলো-ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে অগ্রসর না হয় এবং সে ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের পথও বন্ধ রাখে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে এই নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা। সেই উদ্দেশ্যেই আলোচনায় অংশ নেওয়া হয়েছে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ভ্যান্স দাবি করেন, ইরানের পূর্ববর্তী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোর বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো-ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করবে কি না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে এখনো ব্যাপক দূরত্ব বিদ্যমান। ফলে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক কর্মসূচি-এই দুটি ইস্যুতে মতপার্থক্য সমাধান না হলে পরবর্তী দফার আলোচনাও একইভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।