দেশের গুরুত্বপূর্ণ চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে (ভবিষ্য তহবিল) শত কোটি টাকার বকেয়া জমে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জীবনের শেষ সময়ে আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা হিসেবে যে তহবিল গড়ে ওঠার কথা, সেটিই এখন চা শ্রমিকদের জন্য নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণত কর্মজীবনের শেষে এই তহবিলের অর্থ দিয়েই শ্রমজীবী মানুষ তাদের অবসর জীবন পরিচালনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু চা শিল্পের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করেও তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। সীমিত আয়ের মধ্যে পরিবার চালাতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। এরই মধ্যে প্রাপ্য ভবিষ্য তহবিলের অর্থ না পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেটে ভবিষ্য তহবিলে জমা রাখার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বহু চা বাগানের মালিকপক্ষ সেই অর্থ নিয়মিত জমা দেয়নি। ফলে এই তহবিলে বিশাল অঙ্কের বকেয়া সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, অন্তত ৫৮টি চা বাগানে শ্রমিকদের তহবিলের অর্থ অনাদায়ী রয়েছে। এতে অবসর গ্রহণের পর কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ হাতে পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শ্রমিকরা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। অনেক শ্রমিক অবসরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেও তারা জানেন না, তাদের কষ্টার্জিত অর্থ আদৌ হাতে পাবেন কি না। ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতনের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কেটে রাখা হয় এবং বাগান কর্তৃপক্ষ সমপরিমাণ অর্থ যোগ করে মোট ১৫ শতাংশ তহবিলে জমা দেওয়ার কথা। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে আরও ১৫ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলেই অভিযোগ উঠেছে।
এই তহবিল পরিচালনার জন্য শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান করে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এতে বাগান মালিকপক্ষ, চা শ্রমিক ইউনিয়ন, চা বাগান স্টাফ প্রতিনিধি এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রম সচিব এই তহবিলের নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেন। বোর্ডের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের অনাদায়ী পাওনা আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, একাধিক চা বাগানের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলায় কয়েক কোটি টাকার বকেয়া আদায়ের প্রক্রিয়া চলছে। তবে বাকি বিপুল সংখ্যক বাগানের মোট বকেয়ার পরিমাণ এখনো নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বকেয়ার পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু বাগানে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট চলছে। উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় চায়ের বাজারমূল্য কম থাকায় লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং তদারকির ঘাটতির কারণেও তহবিলের অর্থ নিয়মিত জমা হয়নি। চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কুন্দ বলেন, শ্রমিকদের আয় এমনিতেই সীমিত। তার মধ্য থেকে সামান্য অংশ ভবিষ্য তহবিলে জমা রাখা হয়। সেটিও যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে শ্রমিকদের জীবনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। এ বিষয়ে মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে, বকেয়া তালিকায় থাকা একটি চা বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারণে বাগানটি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মুখে রয়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও চায়ের দাম সে তুলনায় বাড়েনি। তবে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক মহব্বত হোসাইন জানান, ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনাদায়ী অর্থ আদায়ে নিয়মিত তাগিদ দেওয়া হচ্ছে এবং বাগানগুলোর আর্থিক অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। এর ফলে সম্প্রতি প্রায় ১০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছু বাগান আর্থিক সংকটে থাকলেও শ্রমিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বকেয়া আদায়ে কাজ চলমান রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চা শ্রমিকদের ভবিষ্য তহবিলের এই অনিশ্চয়তা দ্রুত নিরসন না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত কার্যকর সমাধান প্রয়োজন।