তিন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের ব্যাংক খাত
সমস্যায় জর্জরিত অর্থনীতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। তবে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং দীর্ঘদিনের সুশাসনহীনতা-এই তিন সংকট সামাল দিয়েই অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে হবে নতুন সরকারকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং অর্থপাচার রোধই হবে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দুর্বল তদারকি, অনিয়ম এবং অপরিকল্পিত ঋণ বিতরণের ফলে ব্যাংক খাত গভীর সংকটে পড়ে। এখন টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের প্রকৃত ক্ষত চিহ্নিত করতে নতুন করে একটি টাস্কফোর্স গঠন জরুরি। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ ইস্যুতে আলাদা ও কঠোর উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া নামে-বেনামে ঋণ বিতরণের কারণেই বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়েছে। এখনই শক্ত হাতে ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ব্যাংক খাত আরও ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ বিতরণ ছিল ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার ৩৫.৭৩ শতাংশই খেলাপি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা থাকলেও বর্তমানে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের এই ভয়াবহ অবস্থার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, শৃঙ্খলা এলে ভুয়া ঋণ বিতরণ বন্ধ হবে, হুন্ডি কমবে এবং একই সঙ্গে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে। খেলাপি ঋণকে তিনি ব্যাংক খাতের ‘ক্যান্সার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, এর সমাধান ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সুশাসন ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়, ছয়টি ব্যাংক একীভূত করা হয় এবং প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি অধ্যাদেশের মাধ্যমে একাধিক আইন প্রণয়ন ও নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। তবে এসব উদ্যোগের পরও ব্যাংক খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতায় পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণও জরুরি। তবে হুন্ডি কমাতে কিছুটা সাফল্য এসেছে, যার ফলে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সময় দেশের রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার, যা অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে দেশে ‘চামচা পুঁজিবাদ থেকে চোরতন্ত্র’ গড়ে ওঠে, যেখানে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলাসহ বিভিন্ন মহল জড়িত ছিল। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, হুন্ডি বন্ধ ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত দেড় বছরে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী অধ্যুষিত দেশগুলোতে ব্যাংকগুলোর প্রচার কার্যক্রমের ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। তার মতে, নতুন সরকারের উচিত হবে হুন্ডির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার সুস্পষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করা।