দোল উৎসব নির্বিঘ্নে পালনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে লালন ভক্তদের ‘খোলা চিঠি’
দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে লালন অনুসারী সাধুসমাজ ও ভক্তরা যেন নির্বিঘ্নে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন—সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন লালন ভক্তরা।
শনিবার প্রকাশিত ওই খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ৩ মার্চ পবিত্র দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে ফকির লালন শাহ-এর আখড়াবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধুসমাজের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। লালন শাহ তাঁর জীবদ্দশায় নিয়মিতভাবে এই পূর্ণিমা উৎসব পালন করতেন এবং সেই ধারাবাহিকতায় আজও লালন অনুসারীরা এ উৎসব উদ্যাপন করে থাকেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোত্র নির্বিশেষে মানবতাবাদী মানুষ যুগ যুগ ধরে দোল পূর্ণিমা পালন করে আসছেন। এই প্রেক্ষাপটে লালন সাধুদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং নির্বিঘ্নে দোল পূর্ণিমা উৎসব ও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
খোলা চিঠিতে আট দফা দাবি
খোলা চিঠিতে মোট আটটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরা হয়েছে—
আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা:
লালন সাধু ও বাউল সম্প্রদায় যেন নিজ নিজ সাধুরীতি অনুযায়ী অবাধে আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন। একই সঙ্গে লালন দর্শনের অনুরাগী ভক্তগণ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনভাবে ভাব প্রকাশের সুযোগ পাবেন—এ বিষয়ে সাধুদের মতামত ও সম্মতির ভিত্তিতে সুস্পষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার:
পহেলা কার্তিক লালন তিরোধান দিবস, দোল পূর্ণিমাসহ অন্যান্য সাধুতিথিতে সাধুআশ্রম ও আখড়াভিত্তিক উৎসবগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় অবস্থিত লালন আখড়াবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ মাজারগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
আখড়াবাড়ির আইনগত সুরক্ষা:
ছেউড়িয়ায় লালন আখড়াসহ নিবন্ধিত আখড়াগুলোর আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের দখল, হয়রানি বা বাধা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনে নতুন করে আখড়া নিবন্ধনের আওতায় আনার দাবিও তোলা হয়েছে।
হয়রানি ও কটূক্তি প্রতিরোধ:
বাউল ও সাধুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অপপ্রচার ও সামাজিক উস্কানির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। পাগল, মস্তান, সন্ন্যাসী ও বাউলদের বেশভূষা ও জীবনাচারে আঘাতের ঘটনাও প্রতিহত করার আহ্বান জানানো হয়।
স্বাধীন চলাচলের নিশ্চয়তা:
সাধু সংস্কৃতি রক্ষার্থে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাধুদের যাতায়াত এবং অনুষ্ঠান পরিচালনায় প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
সরকারি সমন্বয় কমিটি গঠন:
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও লালন সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যোগাযোগ ও তদারকি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লালন আখড়াবাড়িতে সাধুরীতি অনুযায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য বয়োজ্যেষ্ঠ ও খেলাফতি সাধুদের নিয়ে একটি আখড়া পরিচালনা কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
সাধু কল্যাণ তহবিল গঠন:
প্রবীণ ও অসচ্ছল সাধুদের জন্য স্বাস্থ্য সহায়তা ও ন্যূনতম কল্যাণমূলক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ছেউড়িয়ায় লালন একাডেমীর অধিভুক্ত সাধু ও শিল্পী সমাজের জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার জন্য নিবন্ধিত শিল্পী সমাজের ট্রাস্ট গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
লালন সমাধিসৌধ পুনঃনির্মাণ:
উৎসবের সময় লালন আখড়াবাড়ির সমাধিসৌধ এলাকায় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে স্থান সংকুলান কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় লালন অনুসারী সাধুদের মতামত নিয়ে সমাধি ভবনের পুনঃনির্মাণ এখন সময়ের দাবি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারা দিয়েছেন চিঠি
১৩টি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন লালন একাডেমী-এর সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন। চিঠিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- কুষ্টিয়ার লালন একাডেমী, লালন স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা, লালন সেবাসনদ, এসো গড়ি আশার আলো, আয়না মহল, লালন সাহিত্য চর্চ্চা কেন্দ্র, ভাবাশ্রম ও বিশ্ব লালন সংঘ; মেহেরপুরের দৌলত শাহ্ ফাউন্ডেশন;
ঢাকার জাতীয় সাধু সংসদ, ষোলো আনা বাঙালি, ভাব-আধ্যাত্ম ও বোধি চর্চ্চা কেন্দ্র এবং চুয়াডাঙ্গার পারঘাট আয়না মহল।