মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল, বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের খুব অল্প অংশজুড়ে বিস্তৃত হলেও এখানেই রয়েছে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের বড় অংশের মজুত। দীর্ঘ কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনই এই অঞ্চলকে জ্বালানির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
১. টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ
এই অঞ্চলে টেকটোনিক প্লেট—অ্যারাবিয়ান প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষ প্রায় সাড়ে তিন কোটি বছর ধরে চলছে। এই সংঘর্ষে ভূগর্ভে তাপ ও চাপ তৈরি হয়ে শিলাস্তরের ভাঁজ ও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, যা তেল-গ্যাস জমার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।
২. সমৃদ্ধ সোর্স রক (উৎস শিলা)
মধ্যপ্রাচ্যের শিলাস্তরে জৈব পদার্থের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। সামুদ্রিক প্রাণী যেমন প্ল্যাঙ্কটনের অবশেষ কোটি বছরের চাপ ও তাপে রূপান্তরিত হয়ে তেল ও গ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে জুরাসিক ও ক্রিটেসিয়াস যুগের শিলাগুলো অত্যন্ত উচ্চমানের উৎস শিলা হিসেবে কাজ করেছে।
৩. আদর্শ রিজার্ভার কাঠামো
ভূগর্ভের গম্বুজ আকৃতির কাঠামো (ডোম স্ট্রাকচার) এবং ভাঁজ পড়া শিলাস্তর তেল-গ্যাস আটকে রাখার জন্য খুবই কার্যকর।
এ ধরনের কাঠামোর মধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্রগুলোর একটি—ঘাওয়ার তেলক্ষেত্র—অবস্থিত, যেখানে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে।
৪. সহজ উত্তোলনযোগ্য মজুত
মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রগুলোতে তেল তুলনামূলকভাবে অগভীর স্তরে এবং চাপযুক্ত অবস্থায় থাকে। ফলে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখান থেকে তেল উত্তোলন সহজ ও সাশ্রয়ী। অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন হারও বেশি।
৫. বিশাল ‘সুপারজায়ান্ট’ ক্ষেত্র
এই অঞ্চলে ৩০টিরও বেশি ‘সুপারজায়ান্ট’ তেলক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিতে অন্তত ৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। এই বিপুল মজুতই মধ্যপ্রাচ্যকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনন্য করেছে।
৬. প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার
তেলের পাশাপাশি গ্যাসেও সমৃদ্ধ অঞ্চলটি। বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাসক্ষেত্র South Pars–North Dome gas field এখানেই অবস্থিত, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৭. ভূ-প্রাকৃতিক ইতিহাসের ভূমিকা
শেষ বরফযুগের পর বন্যার ফলে পারস্য উপসাগর গঠিত হয়। সেই সময় থেকেই অনেক এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে তেল ও গ্যাস নিঃসরণ দেখা যায়। হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ এই অঞ্চলে বিটুমিন ব্যবহার করত।
৮. বৈশ্বিক জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব
বিশ্বের প্রায় অর্ধেক তেল এবং প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাসের মজুত এই অঞ্চলে রয়েছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।