জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার-সবখানেই এর প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের একযোগে দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নতুন করে বেড়েছে।
এরই মধ্যে অল্প সময়ের ব্যবধানে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)-এর দামও বাড়ানো হয়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। ফলে সার্বিক ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের যুক্তি তুলে ধরা হলেও বাস্তবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ইতোমধ্যে বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সরকারি নির্ধারণ অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সমন্বয় করা হয়েছে। এদিকে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত চাপ ও দীর্ঘ লাইনের চিত্র দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার পরপরই আবারও এলপিজির মূল্য বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। নতুন নির্ধারণ অনুযায়ী ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মাসের শুরুতে এই দাম ছিল ১ হাজার ৭২৮ টাকা। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয়, জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ বৃদ্ধিকে এ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খাতেও পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন মালিকরা মহানগরে বাস ভাড়া সর্বোচ্চ ৬৪ শতাংশ এবং দূরপাল্লায় প্রায় ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌপথে লঞ্চ ভাড়া ৩৬ থেকে ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির বড় অংশই ডিজেলনির্ভর হওয়ায় এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি কৃষি ও পরিবহন খাতে পড়বে। এতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে চাল, সবজি, মাছ ও মুরগিসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কথা জানিয়েছেন ক্রেতারা। কৃষি খাতেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বোরো মৌসুমে সেচে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। একইভাবে শিল্প খাতেও জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অনেক বেশি বাড়লেও দেশে তুলনামূলক সীমিত পরিসরে সমন্বয় করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজার তদারকি জোরদার না হলে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ডা. শফিকুর রহমান জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এটিকে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বোঝা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম বলেছেন, এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত অর্থনীতির প্রায় সব স্তরে এর প্রভাব পড়ে। ফলে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও কঠোর বাজার তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।