ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump। আগামী ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নানা সংকটে চাপে থাকা ট্রাম্প এখন কূটনৈতিক সাফল্যের খোঁজে চীনের সহযোগিতা চাইছেন।
বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশের বেশি নাগরিক ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সহায়তায় তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের বৈঠকে ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হবে বাণিজ্য যুদ্ধের অস্থায়ী সমঝোতা ধরে রাখা এবং চীনের সঙ্গে কিছু সীমিত বাণিজ্য চুক্তি করা। বিশেষ করে কৃষিপণ্য, গরুর মাংস ও উড়োজাহাজ বিক্রিসংক্রান্ত কয়েকটি চুক্তি আলোচনায় আসতে পারে। গত বছর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, উচ্চ শুল্কারোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে সক্ষম হবে। তবে বাস্তবে সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে উল্টো যুক্তরাষ্ট্রকেই নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, বর্তমানে ট্রাম্পের চেয়ে চীন অনেক বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, বিশ্বরাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ট্রাম্পের এখন একটি দৃশ্যমান কূটনৈতিক সাফল্য প্রয়োজন। গত অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে তীব্র বাণিজ্য উত্তেজনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও সম্পর্ক এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক স্থগিত করেছিল এবং চীনও বিরল খনিজ রপ্তানিতে কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসে।
তবে এরই মধ্যে চীন নিজেদের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে বেইজিং। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণভাবেও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। শুল্কনীতি নিয়ে আদালতের রায়, ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেইজিং সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরাও থাকতে পারেন। যদিও আগের সফরের তুলনায় এবারের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল তুলনামূলক ছোট হবে বলে জানা গেছে। বৈঠকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের আটক ইস্যু এবং চীনে আটক থাকা কয়েকজন মার্কিন নাগরিকের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। অন্যদিকে চীনের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে থাকছে তাইওয়ান প্রশ্ন। বেইজিং চায়, ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থি অবস্থানকে সমর্থন করবে না-এমন নিশ্চয়তা দিক।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বড় কোনো অগ্রগতি না হলেও অন্তত সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা এবং বাণিজ্য যুদ্ধের সাময়িক বিরতি বাড়ানোই এই বৈঠকের প্রধান অর্জন হতে পারে। তবে অনেকের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত এটি কেবল একটি সাময়িক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, যা কৌশলগতভাবে চীনের পক্ষেই বেশি সুবিধাজনক হবে।