গ্রিনকার্ডে নতুন কড়াকড়ি, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কঠোরতা
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নীতিগত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের গ্রিনকার্ড বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হলে অনেক ক্ষেত্রে নিজ দেশে ফিরে যেতে হতে পারে। প্রশাসনের দাবি, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রিত, স্বচ্ছ ও কঠোর করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা বিভাগ (ইউএসসিআইএস) সম্প্রতি জারি করা নির্দেশনায় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকেই স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পরিবর্তন বা ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। এটি পুরোপুরি সরকারের বিবেচনাধীন একটি বিষয় এবং প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানায়, যারা অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং ভবিষ্যতে গ্রিনকার্ড পেতে চান, তাদের নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হতে পারে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে অনেকেই সাময়িক ভিসার সুযোগ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতা রোধ এবং অভিবাসন আইনের তথাকথিত ‘ফাঁকফোকর’ বন্ধ করতেই নতুন এই অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
ইউএসসিআইএসের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কাঠামো মূলত এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে অস্থায়ী ভিসাধারীরা নির্ধারিত কাজ, শিক্ষা বা সফর শেষে নিজ দেশে ফিরে যান। তবে নতুন নীতিতে কিছু নমনীয়তাও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিটি আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, ভিসার ধরন, অবস্থানের বৈধতা ও অন্যান্য শর্ত বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে না।
নতুন নির্দেশনায় অভিবাসন কর্মকর্তাদের আরও কঠোরভাবে আবেদন যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় দেওয়া শর্ত মেনে চলেছেন কি না, অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করেছেন কি না, অনুমতি ছাড়া কাজ করেছেন কি না কিংবা কোনো ধরনের জালিয়াতি বা তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে কি না— এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে।
তবে কিছু নির্দিষ্ট ভিসা ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। ইউএসসিআইএস জানিয়েছে, ‘ডুয়াল ইনটেন্ট’ সুবিধাপ্রাপ্ত ভিসাধারীরা একই সঙ্গে অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার আবেদন করতে পারেন। যদিও এই সুবিধা গ্রিনকার্ড নিশ্চিত করে না।
এদিকে নতুন এই নীতির বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন অভিবাসী অধিকার সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, অনেক আবেদনকারীকে এমন দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করা হতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। বিশেষ করে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি, নির্যাতিত শিশু, আশ্রয়প্রার্থী এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আসা মানুষদের জন্য এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
অলাভজনক সংস্থা এইচআইএএস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নতুন নীতির ফলে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা বহু অভিবাসী বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে পারেন, যা তাদের জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। সংগঠনটি আরও বলেছে, অভিবাসন ব্যবস্থাকে কঠোর করার নামে মানবিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হলে বহু পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ তার দীর্ঘদিনের কঠোর অভিবাসন নীতিরই ধারাবাহিকতা। এর আগে শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী এবং বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের ভিসা নীতিতেও কড়াকড়ির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থানরত হাজারো অস্থায়ী ভিসাধারীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।