যুদ্ধ নাকি সমঝোতা,অনিশ্চয়তায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার মধ্যেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির শুক্রবার তেহরান সফরে পৌঁছেছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শান্তি প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে ইরান, যদিও তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে- ওয়াশিংটনের সঙ্গে মতপার্থক্য এখনও গভীর এবং কোনো চূড়ান্ত সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, চলমান আলোচনা ইতিবাচক হলেও এটিকে এখনই কোনো ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা নির্ধারক অগ্রগতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইএসএনএর বরাত দিয়ে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনো বিস্তর মতবিরোধ রয়ে গেছে।
এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আশা প্রকাশ করে বলেন, ইরান যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে জানান, পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত এবং আলোচনায় ব্যর্থতা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অন্য বিকল্পও রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের সূচনা হয়। পরে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে এখনও ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ঐতিহাসিক সরাসরি বৈঠকও শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতা আনতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক মন্তব্যে বলেন, আলোচনা এমন এক অবস্থায় রয়েছে যেখানে যে কোনো সময় সমঝোতা অথবা নতুন করে হামলা-দুই সম্ভাবনাই বিদ্যমান।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, চলমান মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই আসিম মুনির তেহরান সফর করছেন। তেহরানে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি।
এর আগে চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো ইরান সফর করেন মহসিন নাকভি। সফরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার কাতারের একটি প্রতিনিধিদলও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছে। ইসমাইল বাঘাই বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বহু দেশ যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও পাকিস্তান এখনও আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংকট নিরসনে পাকিস্তান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করছে। এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদেই যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সেনাপ্রধান আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে ইরান সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত দাবি’ তোলার অভিযোগ আনে এবং আলোচনা অচল হয়ে পড়ে। এরপর থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব বিনিময় চললেও যুদ্ধের আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
এদিকে ন্যাটো বৈঠকের ফাঁকে সুইডেনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চান, তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। রুবিও আরও বলেন, ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে ন্যাটো মিত্রদের পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় ট্রাম্প হতাশ। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালি খুলে রাখতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিকল্প পরিকল্পনা নিতে হতে পারে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে কার্যত অবরোধ সৃষ্টি করে ইরান। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় হত্যার পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলা শুরু করলে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে লেবাননও। গত ১৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ও সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, সিরিয়া সীমান্তসংলগ্ন পূর্ব লেবাননের কয়েকটি এলাকায় ইসরায়েল পাঁচটি বিমান হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে অন্তত ৩ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে উদ্ধারকর্মী ও শিশুও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট নয়জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাদের মধ্যে লেবাননের দুই সামরিক কর্মকর্তাও রয়েছেন। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তারা লেবানের শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আপাতত থামার কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত না মিললেও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। তবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস দূর না হলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।