দল-সরকারে ভারসাম্য আনতে বিএনপির নতুন কৌশল, পদ হারাতে পারেন মন্ত্রী-এমপিরা
ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও দল পরিচালনায় নতুন কৌশলের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে-মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) দলীয় সাংগঠনিক পদ থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দিয়ে সরকার ও দলের কার্যক্রমকে পৃথক কাঠামোয় পরিচালনা করার। দলীয় সূত্র বলছে, ‘এক নেতা এক পদ’ নীতিকে সামনে রেখে আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের আগে বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটে বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা হতে পারে।
দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জেলা, মহানগর, উপজেলা এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেক মন্ত্রী ও এমপিকে সাংগঠনিক দায়িত্ব ছাড়তে বলা হতে পারে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও মূল লক্ষ্য হচ্ছে-দল ও সরকারের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি এবং নতুন নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, সরকার পরিচালনা ও দল গোছানোর কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে অনেক নেতা কার্যকরভাবে কোনো দায়িত্বই ঠিকমতো পালন করতে পারছেন না। এ কারণে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা নেতাদের সরকারি কাজে পূর্ণ মনোযোগী করার চিন্তা থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ইতোমধ্যে এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কয়েকজন নেতা দলীয় পদ ছেড়েছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতির পদ ছেড়ে দিয়েছেন। একইভাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে জানা গেছে।
দলটির সিনিয়র নেতাদের ভাষ্য, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দল ও সরকারকে পৃথকভাবে পরিচালনার নীতি অনুসরণ করতেন। তার সময়েও মন্ত্রী ও এমপিদের দলীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে না রাখার একটি অলিখিত সংস্কৃতি ছিল। বর্তমান নেতৃত্ব সেই মডেল অনুসরণ করেই সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে বলে দাবি করেছেন দলটির নেতারা।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, আসন্ন সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটিতেও পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। এসব সংগঠনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বর্তমানে এমপি ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব আনার আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন না থাকলে প্রশাসনিক জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা মনে করছেন, মন্ত্রীরা প্রশাসনিক দায়িত্বে এবং অন্য নেতারা সাংগঠনিক কাজে মনোযোগী হলে দল ও সরকার উভয়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। দিলারা চৌধুরী বলেন, সরকার ও দল একই কাঠামোয় পরিচালিত হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও দলকে পৃথকভাবে পরিচালনা করাই স্বাস্থ্যকর রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, অতীতে অনেক নেতা মন্ত্রী বা এমপি হওয়ার পর স্বেচ্ছায় সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দিতেন। এখন আবারও সেই নীতিকে কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি জানান, সরকার ও দলের কাজের সমন্বয় নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
দলটির উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জিয়াউর রহমানের সময়ে দলীয় নেতাদের মধ্যে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি ছিল। বর্তমান নেতৃত্বও একই ধারা অনুসরণ করে দলকে আরও সংগঠিত ও কার্যকর করতে চায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি যদি সত্যিই ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে দলটির সাংগঠনিক কাঠামোয় নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে। একই সঙ্গে সরকার পরিচালনায়ও গতি বাড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।