বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত, সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে আনছে সরকার
রাজধানীর অন্যতম বড় আবাসিক প্রকল্প বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে পুরোপুরি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ৭ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট নথিতে অনুমোদন দেন।
দীর্ঘদিন ধরেই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ বসুন্ধরা গ্রুপের হাতে রয়েছে। বাসিন্দাদের অনেকেই অভিযোগ করছেন, এলাকাটি যেন “রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র”-এ পরিণত হয়েছে। সেখানে নিজস্ব নিয়মে সবকিছু পরিচালনা করে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ব্যক্তিমালিকের কাছ থেকে জমি কিনলে ক্রেতাদের সরকার নির্ধারিত করের বাইরে বসুন্ধরা গ্রুপকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। আগে এই অর্থের পরিমাণ ছিল কাঠাপ্রতি ১০ লাখ টাকা, বর্তমানে তা কমিয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ফ্ল্যাটমালিক ও ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকেও বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়।প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর আয়তনের এই আবাসিক এলাকায় নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও নাগরিক সুবিধা পরিচালনা করে বসুন্ধরা গ্রুপ। অথচ এলাকাটি ২০১৬ সালেই সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে এতদিন কার্যকরভাবে সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি।
সরকারি সূত্র বলছে, নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এলাকাটির গৃহকর আদায়, নাগরিক সেবা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের নিয়ন্ত্রণ সিটি করপোরেশনের হাতে যাবে। পাশাপাশি পুলিশের পৃথক থানা ও অন্যান্য সরকারি সেবাও চালু করা হবে। তখন বসুন্ধরা গ্রুপ বা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বাসিন্দাদের কাছ থেকে আলাদা ফি আদায় করতে পারবে না। মন্ত্রিসভার কার্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গেজেটভুক্ত সব এলাকায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো নিজ নিজ আইন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এ বিষয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার আব্দুল বারী জানিয়েছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত তারা পর্যালোচনা করছে। পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হবে। তাদের দাবি, রাস্তাঘাট, সেতু, সড়কবাতি, বৃক্ষরোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। তবে রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “প্রকল্পের উন্নয়ন শেষ হলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতেই হবে।”
২০০৪ সালের বেসরকারি আবাসিক প্রকল্প উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১০ বছরের মধ্যে প্রকল্পের উন্নয়ন সম্পন্ন করে নাগরিক সুবিধাগুলো সরকারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। যদিও বসুন্ধরা প্রকল্প ১৯৮৭ সালে শুরু হলেও এখনো পুরো নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করা হয়নি। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বসুন্ধরা গ্রুপ বারবার সময় চেয়ে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাচ্ছে। কারণ এলাকাটিতে আবাসন ছাড়াও নির্মাণসামগ্রী, এলপিজি, পরিবহন, কেবল টিভি, ইন্টারনেট ও অন্যান্য সেবাখাত থেকে বড় অঙ্কের আয় হয়।
এলাকার কিছু বাসিন্দা বলছেন, বসুন্ধরার নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা ভালো হলেও অনেক ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ধরনের নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়। নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। আবার গ্রুপের শীর্ষ ব্যক্তিরা চলাচলের সময় রাস্তাঘাট বন্ধ করে বিশেষ প্রটোকল দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র থাকতে পারে না। আইন অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলে তা সরকারি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতেই হবে। বর্তমানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা দুই লাখেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার এখন এলাকাটিকে পুরোপুরি সিটি করপোরেশনের আওতায় এনে নাগরিক সেবাকে সরকারি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে চায়।