মুসলিমদের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ জমজমের পানি?
পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামের ভেতরে কাবাঘরের অদূরে অবস্থিত জমজম কূপ মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান এই কূপের পানিকে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকতের নিদর্শন হিসেবে বিশ্বাস করে আসছেন। প্রতি বছর হজ ও ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে যাওয়া অধিকাংশ মুসল্লিই দেশে ফেরেন জমজমের পানি সঙ্গে নিয়ে।
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, হাজার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহর নির্দেশে নবী ইব্রাহিম (আ.) তার স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশু পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে জনমানবহীন মরুভূমি মক্কায় রেখে যান। সে সময় সেখানে ছিল না কোনো পানির উৎস কিংবা বসতি।
খাবার ও পানির সংকট দেখা দিলে তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাইল (আ.)-এর জন্য পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে ছুটতে থাকেন হাজেরা (আ.)। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, তার সেই আকুল প্রার্থনার পর আল্লাহর রহমতে ফেরেশতা জিবরাইলের মাধ্যমে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসে পানির ধারা। পরবর্তীতে সেটিই জমজম কূপ হিসেবে পরিচিতি পায়।
ইসলামের ইতিহাসবিদদের মতে, এই কূপকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে মক্কায় জনবসতি গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে কাবাঘরকে ঘিরে নগরীর বিকাশ ঘটে। মুসলমানদের বিশ্বাস, এটি আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ কূপ, যার পানি বরকতময় ও পবিত্র। হাদিসে জমজমের পানির বিশেষ ফজিলতের কথাও উল্লেখ রয়েছে। ইসলামী সূত্রগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জমজমের পানিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মুসলিমদের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে, নিয়ত ও দোয়ার সঙ্গে এই পানি পান করলে আল্লাহর রহমতে উপকার লাভ করা যায়।
হজের আনুষ্ঠানিক ফরজ বা ওয়াজিবের অংশ না হলেও জমজমের পানি পান করা দীর্ঘদিনের সুন্নতি আমল হিসেবে পরিচিত। হজ বা ওমরাহ পালনকারীরা তাওয়াফ ও সাঈ শেষে এই পানি পান করেন এবং আত্মীয়-স্বজনদের জন্যও নিয়ে আসেন।
বর্তমানে সৌদি কর্তৃপক্ষ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জমজম কূপের পানি সংরক্ষণ, পরিশোধন ও সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভিন্ন গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে পানির মানও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। সৌদি জিওলজিক্যাল সার্ভের অধীনে পরিচালিত জমজম স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার কূপটির রক্ষণাবেক্ষণ ও পানির গুণগত মান তদারকি করে থাকে।
গবেষকদের মতে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে অবিরাম প্রবাহমান এই কূপ বিশ্বের প্রাচীনতম পানির উৎসগুলোর একটি। মরুভূমির মাঝে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এখনো এখান থেকে প্রতিনিয়ত পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ইসলামী বিশ্বাস, ইতিহাস, ধর্মীয় আবেগ ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের কারণেই জমজমের পানি মুসলিমদের কাছে বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব বহন করে আসছে যুগের পর যুগ।