‘বড় ভাই-ছোট বোন’ মন্তব্যে নতুন বার্তা মোদি-তাকাইচির
ভারত ও জাপানের কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পারস্পরিক সম্পর্ককে ‘বড় ভাই’ ও ‘ছোট বোন’-এর সঙ্গে তুলনা করে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার প্রতীকী বার্তা দেন।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তাকাইচি বলেন, তাকে ‘সুন্দরী ছোট বোন’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। তিনি জানান, আগের আলোচনাতেও দুই নেতা ভাই-বোনের মতো পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তাকাইচির প্রথম ভারত সফর। সফরে বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ ঘোষণার পরিবর্তে দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠকে যৌথ নৌমহড়া, বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা এবং জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপে একটি বলিউড চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। দুই দেশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে চারটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি ভারত ও জাপানের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০০টিরও বেশি সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় সেমিকন্ডাক্টর, সবুজ জ্বালানি, অ্যামোনিয়া উৎপাদন, চাঁদে যৌথ মহাকাশ অভিযান এবং ভারতে শিটাকে মাশরুম ও স্ট্রবেরি চাষে সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারতে জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান কেনজি হিরামাসু বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের প্রতি জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠী নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও ভারতের বাজার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক মূলত অটোমোবাইল শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও এখন প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক সহযোগিতার ক্ষেত্র দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে আগামী এক দশকে ভারতে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি জাপান সরকার দিয়েছিল, বর্তমান উদ্যোগকে তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে জানানো হয়, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ভারতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সফরে ৫০ জনের বেশি জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি অংশ নেন। তাদের মধ্যে সুজুকি মোটর করপোরেশনের চেয়ারম্যানও ছিলেন। ভারতের বাজার বর্তমানে সুজুকির সবচেয়ে বড় বাজার এবং প্রতিষ্ঠানটির আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
অন্যদিকে, ভারতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপ ডলারের পরিবর্তে ইয়েনভিত্তিক ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বৈদেশিক অর্থায়নে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর কৌশলের অংশ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এমন এক সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো যখন ভারত ও জাপান উভয়ই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে আগ্রহী।
তাকাইচি বলেন, ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জ্বালানি ও প্রযুক্তির নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতিকে বৈশ্বিক ধাক্কার প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য অর্জনে ভারত ও জাপানের যৌথভাবে কাজ করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।