বড় বাজেটে বাড়ছে ঘাটতির চাপ, রাজস্ব আদায় নিয়ে উদ্বেগ
দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছে, তখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৭ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। তবে এই বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আহরণ এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। রাজধানীর একটি বস্তিতে বসবাসকারী রহিমার মতো অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম করছেন। অসুস্থতা ও কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে তার পরিবারের আয় কমে গেলেও ব্যয় বেড়েই চলেছে। তার প্রত্যাশা, বাজেটে দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির প্রভাবে দেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বেড়েছে। তারা বলছেন, শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ নয়, অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটের ব্যয় কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ পরিচালন খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), ঋণ পরিশোধ এবং খাদ্য খাতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাজেটের আকার যত বড় হচ্ছে, ঘাটতির পরিমাণও তত বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি প্রস্তাব করা হতে পারে। এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, রাজস্ব আয় দ্রুত বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় কোন খাতে ব্যয় অপরিহার্য এবং কোন খাতে ব্যয় কমানো যায়, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর ও অন্যান্য কর থেকে আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য উৎস থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও বিশ্বমানের তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আসন্ন বাজেট হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণমুখী। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে সুশাসন ও বাস্তবমুখী নীতির বিকল্প নেই।