কৃষি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও পানি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি বাড়াতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সংলাপ ৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, সেচ সুবিধা, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও সহজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানোর কথা জানান তিনি। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানির ওপর জোর দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে।
উন্নয়নের জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার করা হচ্ছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার পাশাপাশি সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মিয়ানমারে দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ জন্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের নীতিগত নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতাকে এ নিশ্চয়তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’, ‘হেলথ কার্ড’ ও ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এর কথা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মায়েদের কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছানো হবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ঘরে ঘরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এসব কর্মী তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রেফারেল সেবা দেবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
শিক্ষা ও তরুণদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু সনদনির্ভর না রেখে বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর কথা বলেন তারেক রহমান। তরুণদের উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষির জন্য আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও বলেন তিনি। এসব উদ্যোগ কৃষি ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ২০ হাজার কিলোমিটার খাল-নদী খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার কথা এর আগেও সরকারি বক্তব্যে এসেছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে। জাহাজ চলাচল, মৎস্য, পর্যটন ও জ্বালানি খাতে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে চায়। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি শান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি সহযোগিতামূলক অঞ্চলে পরিণত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারেক রহমান, যেখানে দেশগুলো পারস্পরিক সুবিধা ও অভিন্ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।