তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের মধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি। এরই মধ্যে সামনে এসেছে দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদিত ৩৬টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের তথ্য। সংশ্লিষ্ট নথি ও সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট।
প্রকল্পগুলোর একটি অংশ ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসার কথা ছিল। কয়েকটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমি কেনা ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এসব প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল করা হয়।
বাতিল প্রকল্পের বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ
নথি অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৩৬টি প্রকল্পের অধিকাংশই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে দেবীগঞ্জ-পঞ্চগড় ২০ মেগাওয়াট, মৌলভীবাজার ১০ মেগাওয়াট, পঞ্চগড় ৫০ মেগাওয়াট, বারইয়ারহাট-চট্টগ্রাম ৫০ মেগাওয়াট, তেরখাদা-খুলনা ৫০ মেগাওয়াট, চুয়াডাঙ্গা ৫০ মেগাওয়াট এবং মাদারগঞ্জ-জামালপুর ১০০ মেগাওয়াটের সৌর প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া ঈশ্বরদী-পাবনা ৭০ মেগাওয়াট, মুক্তাগাছা-ময়মনসিংহ ৫০ মেগাওয়াট, ডিমলা-নীলফামারী ৫০ মেগাওয়াট, কক্সবাজার ১০০ মেগাওয়াট, লামা-বান্দরবান ৭০ মেগাওয়াট এবং গজারিয়া ১৩০ মেগাওয়াটের সৌর প্রকল্পও বাতিলের তালিকায় ছিল। এসব প্রকল্পের কয়েকটির উৎপাদন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই শুরু হওয়ার কথা ছিল।
আরও কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যে বোচাগঞ্জ-পীরগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট, ঘোড়াধাপ-জামালপুর ১৮০ মেগাওয়াট, সোনাগাজী ১০০ মেগাওয়াট, বাসাইল-টাঙ্গাইল ১০০ মেগাওয়াট, আশাশুনি-সাতক্ষীরা ১০০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র, চকরিয়া ২২০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজার সদর ৫০ মেগাওয়াটের সৌর প্রকল্প ছিল। এসবের কয়েকটির উৎপাদন চলতি বছরের জুনে শুরু হওয়ার কথা ছিল।
এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া ২০০ মেগাওয়াট, মাছুয়াখালী-কক্সবাজার ১০০ মেগাওয়াট, গৌরীপুর-ময়মনসিংহ ১০০ মেগাওয়াট, মংলা-বাগেরহাট ১০০ মেগাওয়াট, নেত্রকোনা ৫০ মেগাওয়াট এবং গোয়ালন্দ-রাজবাড়ী ১০০ মেগাওয়াটের সৌর প্রকল্পও বাতিলের তালিকায় ছিল। গোয়ালন্দ প্রকল্পটি চলতি ডিসেম্বর এবং রামপাল ৩০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
সংকটের সময়ে গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কতটা ছিল?
জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে বিভিন্ন সময়ে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। ওই সংকটের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে ৬৫০ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাতিল প্রকল্পগুলোর অন্তত একটি অংশ নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে আসতে পারলে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ কিছুটা কমতে পারত।
কেন বাতিল হলো প্রকল্পগুলো?
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই ৩৬টি প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল করা হয়। তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর এলওআই ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়ে দেওয়া হয়েছিল। অন্তত ১৫টি কোম্পানি এরই মধ্যে জমি কেনা, সরকারি কর-ফি পরিশোধ এবং অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করেছিল।
নতুন দরপত্রেও কম সাড়া
বাতিল প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে ৫৫টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব প্রকল্প থেকে প্রায় ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।
তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১১টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র জমা পড়ে। এসব প্রস্তাবের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন প্রকল্পে সভরেন গ্যারান্টি না থাকা বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের গ্যারান্টি গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
দায়মুক্তি আইন নিয়ে বিতর্ক
২০০৯-১০ সালের বিদ্যুৎ সংকটের পর দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ প্রণয়ন করে। আইনটির আওতায় প্রচলিত সরকারি ক্রয় ও উন্মুক্ত দরপত্রের বাইরে বিশেষ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের সুযোগ ছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, এর মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে আইনটি নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বাইরে প্রকল্প অনুমোদনের কারণে ব্যয় বৃদ্ধি ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর হাইকোর্ট আইনটির ৬(২) ও ৯ ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এরপর ২৮ নভেম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি বাতিল করা হয়। তবে আগে সম্পাদিত চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পুনর্মূল্যায়নের দাবি
আইন বাতিলের পর দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে পাইপলাইনে থাকা ৩৬টি জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পের এলওআই বাতিল করা হয়।
তবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) সম্প্রতি বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব প্রকল্পে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা ছিল। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও সুযোগ-সুবিধা তৈরির তাগিদ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলমের মতে, প্রকল্পগুলোর মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করা যেত। অন্যদিকে বিপিডিবির আইপিপি সেলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হক জানিয়েছেন, যেসব কেন্দ্রের সঙ্গে পিডিবির চুক্তি হয়নি, সেগুলো উৎপাদনে আসার সুযোগ নেই। তবে অবকাঠামোগত কাজ শুরু করা কিছু প্রকল্পের জন্য নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
রূপক/অরণ্য/16 সেপ্টেম্বর ২৬