দীর্ঘ ১৭ বছর পর আবারও নৌকার বৈঠার ছন্দ, মাঝিমাল্লাদের হেঁইও হেঁইও ডাক আর দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠল মাগুরা-মহম্মদপুরের সংযোগস্থল পলিতা-নহাটা এলাকার নবগঙ্গা নদী। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বেরইল পলিতা বাজারসংলগ্ন নদীতে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। এ আয়োজন ঘিরে নদীর দুই পাড়ে বসে জমজমাট লোকজ মেলা।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে আগের দুই দিন থেকেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। বেরইল বাজার ও নবগঙ্গার দুই তীরে বসে নানা ধরনের দোকান। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী, গ্রামীণ কারুশিল্প, খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা নিয়ে হাজির হন স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা।
বুধবার বিকেলে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর মুহূর্তেই বদলে যায় নবগঙ্গার পরিবেশ। সারিবদ্ধ নৌকাগুলো যখন ছুটে চলে নদীর বুকে, তখন বৈঠার ছন্দে জেগে ওঠে পানির ঢেউ। মাঝিমাল্লাদের সম্মিলিত হেঁইও হেঁইও ধ্বনি, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে প্রতিযোগীদের প্রাণপণ চেষ্টা এবং দুই তীরের দর্শকদের করতালিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন। মাগুরা ও মহম্মদপুরের পাশাপাশি শালিখা, শ্রীপুর, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও বোয়ালমারীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষ, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা ছুটে আসেন এ আয়োজনে।
নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ উপভোগ করেন ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আবার কেউবা দূর-দূরান্ত থেকে শুধু নৌকাবাইচের আনন্দ উপভোগ করতেই হাজির হন।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই দীর্ঘ বিরতির পর এ নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে। নবগঙ্গা নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়াতেও এমন আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নৌকাবাইচকে ঘিরে বসা মেলায়ও ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের পণ্য নিয়ে দোকান সাজান। ফলে নৌকাবাইচের পাশাপাশি মেলাও পরিণত হয় বড় ধরনের লোকজ মিলনমেলায়।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর নবগঙ্গার বুকে এমন আয়োজন ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। নদী, নৌকা, বৈঠার ছন্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাসে একদিনের জন্য যেন ফিরে আসে চিরচেনা গ্রামবাংলার সেই হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির আবহ।