রংপুরে একই পরিবারের চার খুনের কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা
রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়ায় শনিবার (22 আগষ্ট) রাতে নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বাড়ির প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ঘরের ভেতর আসবাবপত্র ও আলমারি এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ডাকাতির পর পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে ঘটনার প্রায় তিন দিন পর মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এত সময় ধরে বাড়িতে মরদেহ পড়ে থাকার পরও আশপাশের বাসিন্দারা দুর্গন্ধ বা অন্য কোনো বিষয় টের না পাওয়ায় ঘটনাটি রহস্যজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার সময় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ফোন বন্ধ, বাড়িতে গিয়ে মিলল ভয়াবহ দৃশ্য
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে গণপতি চক্রবর্তির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনে কথা হয়। এরপর রোববার রাত পৌনে ৯টার দিকে বড় বোন প্রিতিলতা চক্রবর্তিকে ফোন করেন তাঁর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী। ফোন বন্ধ পেয়ে তিনি একে একে দুলাভাই, ভাগনি ও ভাগনেকেও ফোন করেন। সবার ফোন বন্ধ পাওয়ার পর সন্দেহ হয় তাঁর।
পরে স্বামী বিপুল আচার্যকে সঙ্গে নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর মাছুয়াপাড়ায় বোনের বাড়িতে যান পূজা। সেখানে গিয়ে প্রধান ফটক তালাবদ্ধ দেখতে পান তারা। পাশের বাড়ির ভেতর দিয়ে বাড়িটিতে প্রবেশ করে ভেতরের দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান স্বজনরা। ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ও আলমারি খোলা ছিল। মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন জিনিসপত্র।
পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সিআইডি, পিবিআইসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা বাড়িটি ঘিরে ফেলেন এবং আলামত সংগ্রহ শুরু করেন।
যেভাবে চার মরদেহ উদ্ধার
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, বাড়ির ছাদে ওঠার সিঁড়ির চিলেকোঠার নিচ থেকে প্রিতিলতা চক্রবর্তী ও তাঁর মেয়ে প্রার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তির মরদেহ। আর ঘরের একটি খাটের নিচে পাওয়া যায় ছেলে প্রিয়মের মরদেহ।
গণপতির বিছানায় মশারি টানানো ছিল। পাশের টেবিলে পড়ে ছিল ছেলে প্রিয়মের স্কুলের পরিচয়পত্র। এসব আলামত দেখে পরিবারের সদস্যরা স্বাভাবিকভাবে রাতযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার পর কোনো একসময় বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে এবং এরপর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়।
তিন দিনেও টের পাননি প্রতিবেশীরা
ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে মরদেহ উদ্ধারের সময় নিয়ে। প্রায় তিন দিন ধরে বাড়ির ভেতরে মরদেহ পড়ে থাকলেও আশপাশের বাসিন্দারা বিষয়টি বুঝতে পারেননি।
প্রতিবেশীদের কয়েকজন জানান, বুধবার ও বৃহস্পতিবারও পরিবারের চার সদস্যের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছিল। এমনকি বৃহস্পতিবার দুপুরে ছেলে প্রিয়ম পাশের একটি দোকান থেকে চেকলেট কিনেছিল বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পাশের তিনতলা ভবনের একজন ভাড়াটিয়া নিয়মিত ছাদে থাকা বাগানে পানি দিলেও পাশের বাড়ির ছাদে মরদেহ পড়ে থাকার বিষয়টি তাঁর নজরে আসেনি বলে জানা গেছে।
টাকার জন্য হুমকির অভিযোগ
স্বজনদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বাড়ি নির্মাণের সময় অর্থসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গণপতি চক্রবর্তিকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় পূর্বশত্রুতা বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণের দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে।
আলামত সংগ্রহ, তদন্ত শুরু
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে। ভোর ৫টার দিকে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর চারজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। সিআইডির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করার পর গলায় রশি ও গামছা পেঁচিয়ে পরিবারের সদস্যদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হতে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
সিআইডি রংপুরের এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত কুমার এবং রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত ও সম্ভাব্য ক্লু বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নিহতদের পরিচয়
নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল গত ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। তাঁর স্ত্রী প্রিতিলতা চক্রবর্তী ছিলেন গৃহিণী।
তাদের মেয়ে প্রার্থনা চক্রবর্তী কয়েক দিন আগে কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। একই পরিবারের চারজনকে এভাবে হত্যার ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত-এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্বজন ও নগরবাসী।