‘নদী বেঁধে দেন, গ্রামটা বাঁচান’-নবগঙ্গার ভাঙনে দিশেহারা ইসলামপুরবাসী
আমাদের একটাই দাবি, নদী বেঁধে দেন, গ্রামটা রক্ষা করেন। ভাঙনের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারি না। আগে দুটি ঘর নদীগর্ভে চলে গেছে, আরেকটি ঘর এখন ভাঙনের মুখে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে। বসতঘরটাও যদি নদীতে চলে যায়, তাহলে কোথায় আশ্রয় নেব?”- কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন নড়াইলের নড়াগাতী থানার মাউলি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা রোজিনা বেগম।
নবগঙ্গা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গত এক দশক ধরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইসলামপুর গ্রাম। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি। ভাঙন অব্যাহত থাকায় দিন দিন বাড়ছে উদ্বেগ। দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে নতুন করে আতঙ্কে থাকতে হয় নদীপাড়ের মানুষকে।
গ্রামবাসীদের ভাষ্য, নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। অনেকে বসতভিটা হারিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঠাঁই নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। বর্তমানে আরও ৮০ থেকে ৯০টি বাড়িঘর এবং বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আতিয়ার মোল্যা বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে ইসলামপুর পূর্বপাড়া ভাঙনের শিকার হলেও এখনো কার্যকর কোনো প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হবে। আতিক কাজী জানান, গ্রামটির বহু বাড়ি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে অবশিষ্ট বাড়িঘর ও কৃষিজমিও হুমকির মুখে পড়বে।
বৃদ্ধা ময়না বেগম বলেন, “এই বসতভিটা ছাড়া আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। গরিব মানুষ হিসেবে নতুন করে ঘর তৈরির সামর্থ্যও নেই। নদী যদি এটুকুও কেড়ে নেয়, তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়াব?” স্থানীয় আজগর মোল্যা বলেন, ভাঙনের কারণে কয়েক বছর আগে তার দুই চাচা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে তার নিজের জমিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। একই দাবি জানিয়ে প্রবীণ বাসিন্দা খাজা ফকির বলেন, “ইতোমধ্যে বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমাদের আবেদন, দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিন এবং গ্রামটিকে রক্ষা করুন।”
ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত পদক্ষেপের দাবিতে গত ৩ জুলাই নদীপাড়ে মানববন্ধনও করেন এলাকাবাসী। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা জানান, নদীভাঙনের আতঙ্কে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। দীর্ঘদিনের ভাঙনে গ্রামের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, মধুমতি ও নবগঙ্গা নদী অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ। এসব নদীতে ভাঙন প্রতিরোধে একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদিত হলে স্থায়ী প্রতিরোধমূলক কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আপদকালীন কর্মসূচির আওতায় মানুষের বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার চেষ্টা করা হবে।