চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত, ছয় বছর ধরে তালাবদ্ধ—শেষ পর্যন্ত বদলে যাচ্ছে বগুড়ার বার্ন ইউনিটের পরিচয়। অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্মিত ১০ শয্যার ইউনিটটি প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে একদিনের জন্যও চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সেখানে আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বগুড়ার ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল চত্বরে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বার্ন ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের অক্টোবরে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ইউনিটটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের পর থেকেই পড়ে আছে তালাবদ্ধ অবস্থায়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বগুড়া ও আশপাশের এলাকার অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার সুবিধা বাড়াতে ২০১৫ সালে ১০ শয্যার এই ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর গণপূর্ত বিভাগ দরপত্র আহ্বান করে। ২০১৮ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ, যা পরের বছর শেষ হয়।
কিন্তু ভবন প্রস্তুত হলেও চিকিৎসাসেবা শুরু করার মতো প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম আর পাওয়া যায়নি। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠালেও কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি।
কত জনবল প্রয়োজন ছিল?
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, বার্ন ইউনিটটি চালু করতে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার, চারজন ইনডোর মেডিকেল অফিসার, চারজন মেডিকেল অফিসার ও দুজন অবেদনবিদ প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি ১৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স, ১২ জন অফিস সহায়ক, ১২ জন ওয়ার্ডবয় এবং আটজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এসব পদ সৃষ্টি কিংবা পদায়ন কোনোটিই এখনো হয়নি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
অথচ ইউনিটটিতে রয়েছে ১০টি আধুনিক শয্যা, দুটি বিশেষায়িত ওয়ার্ড, অস্ত্রোপচার কক্ষ, পর্যবেক্ষণ ইউনিট, চিকিৎসকদের চেম্বার ও বিশ্রামকক্ষসহ বেশ কিছু অবকাঠামোগত সুবিধা। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় এসব স্থাপনা ও সরঞ্জাম-সহায়ক অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিন বছরে ৩৮৯ অগ্নিদগ্ধ রোগী
বগুড়ার দুটি সরকারি হাসপাতালে গত তিন বছরে আগুনে পোড়া ৩৮৯ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। গুরুতর অবস্থায় থাকা ৩৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে পৃথক পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট না থাকায় এসব রোগীকে সার্জারি বিভাগসহ হাসপাতালের বিদ্যমান সাধারণ ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দিতে হয়েছে। গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে ঢাকায় স্থানান্তর করতে হওয়ায় সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের।
পরিদর্শনের পর বদলে গেল পরিকল্পনা
বার্ন ইউনিট চালুর জন্য সর্বশেষ গত ২ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে চিঠি পাঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর কয়েক সপ্তাহ পর ১৯ আগস্ট বগুড়া সফরে এসে ইউনিটটি পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিদর্শনের পর স্বাস্থ্য সচিব জানান, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান অবকাঠামোটি বরং আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বার্ন ইউনিটের কার্যক্রম বাতিল করে একই জায়গায় আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, ভবন বুঝে পাওয়ার পর থেকেই বার্ন ইউনিট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও সরঞ্জাম চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি বা পদায়ন হয়নি, যন্ত্রপাতিও পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, সর্বশেষ চিঠিতেও বার্ন ইউনিট চালুর জন্য জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম চাওয়া হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য সচিব পরিদর্শনের পর ইউনিটটি বার্ন চিকিৎসার জন্য না খুলে আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
বগুড়া অঞ্চলে প্রতিবছর অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিটের অভাবে গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিট ছয় বছরেও চালু না হওয়া এবং এখন সেটিকে ভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসেবায় ব্যবহারের উদ্যোগ সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।