হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এবার প্রণালিটির বাইরে একটি নতুন ‘বর্জন অঞ্চল’ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের দাবি, ওই এলাকায় ঢুকে হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা কোনো জাহাজ শনাক্ত হলে সেটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান মোহসেন রেজায়ি রোববার এ পরিকল্পনার কথা জানান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে নতুন অঞ্চলটির ঘোষণা আসতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত এলাকার সুনির্দিষ্ট সীমানা কিংবা সেখানে কী ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
রেজায়ির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বর্জন অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সীমা থেকে শুরু হয়ে হরমুজ প্রণালির দিকে এবং সেখান থেকে পারস্য উপসাগরের অভ্যন্তরীণ অংশে বিস্তৃত হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ওই এলাকায় হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের উদ্দেশ্যে কোনো জাহাজ গেলে এবং সেটি শনাক্ত করা হলে, সংশ্লিষ্ট জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
হরমুজ ঘিরে বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ চালানোর চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ইরানের বন্দর ও তেল রপ্তানি কার্যক্রমের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ এ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। রোববার পর্যন্ত এসব জাহাজ ৯২টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে এবং আরও তিনটি জাহাজের চলাচল বন্ধ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এরই মধ্যে ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ইরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। বিশ্লেষকদের অনেকে এটিকে সংঘাতের মাত্রা বাড়ার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
ইরান আরও দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের চেষ্টা করা একটি চালকবিহীন মার্কিন নৌযানে তারা হামলা চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে।
তেল সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিটির নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো বড় ধরনের সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হচ্ছে। তবে ট্যাংকার চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ২৮ দিনের গড় পরিবহনের তুলনায় এই হিসাব বেশি হতে পারে।
রাইটের দাবি, এই অঞ্চলের বিকল্প পাইপলাইনগুলোর মাধ্যমেও তেল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে এবং সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় মোট সরবরাহের দুই-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি এখনো চালু রয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সম্ভাব্য ইরানি হামলা থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষায় এ নিরাপত্তা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও এই উদ্যোগে যুক্ত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী।
তেল বিক্রি অব্যাহত রাখার দাবি ইরানের
অন্যদিকে মার্কিন চাপ ও নৌ অবরোধ সত্ত্বেও ইরানের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছেন রেজায়ি। তার ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি করছে ইরান।
দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রির বিভিন্ন পথ তৈরি করেছে তেহরান। বর্তমান পরিস্থিতিতেও বন্দর ও সামুদ্রিক পরিবহনে চাপের মধ্য দিয়ে তেল ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
কূটনৈতিক আলোচনাতেও অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেঙে পড়া আলোচনার বিষয়েও সতর্ক অবস্থান জানিয়েছেন রেজায়ি। পাকিস্তান, কাতার ও ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার মতে, মধ্যস্থতাকারীরা কোনো পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করলে সেটি ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তেহরানের। এখন ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনা কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে নতুন করে নিশ্চয়তা চাওয়া হচ্ছে।
এ অবস্থায় হরমুজের বাইরে নতুন ‘বর্জন অঞ্চল’ তৈরির ইরানি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।