বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে নির্ভীকতা, সততা ও পেশাগত দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল নাম আর এম সাইফুল আলম মুকুল। সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এই সাংবাদিক অন্যায়, অনিয়ম ও অপরাধের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কলম কখনো ভয় কিংবা চাপের কাছে নত হয়নি। তবে সেই সাহসী কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
আজ ৩০ আগস্ট। ১৯৯৮ সালের এই দিনে যশোরে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন দৈনিক রানারের সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুল। তাঁর মৃত্যুর ২৮ বছর পূর্ণ হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় স্বজন, সহকর্মী এবং সাংবাদিক সমাজের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ, বেদনা ও হতাশা।
সাংবাদিকতা ছিল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার নাম
আর এম সাইফুল আলম মুকুলের কাছে সাংবাদিকতা ছিল কেবল পেশা নয়; মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে কথা বলার একটি দায়িত্ব। দৈনিক রানারের সম্পাদক হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের সমস্যা, সমাজের অনিয়ম এবং নানা অপরাধের খবর সাহসের সঙ্গে তুলে ধরতেন। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি সাধারণ মানুষের কথা বলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রতিকূল পরিবেশেও সংবাদ প্রকাশে আপস না করার কারণে সহকর্মী ও সাংবাদিকদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাহসের প্রতীক।
যেভাবে প্রাণ গেল নির্ভীক সম্পাদকের
১৯৯৮ সালের ৩০ আগস্ট রাতে যশোর শহরের বেজপাড়ায় নিজ বাসায় ফেরার পথে হামলার শিকার হন আর এম সাইফুল আলম মুকুল। শহরের চারখাম্বার মোড়ে দুর্বৃত্তদের বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। হত্যাকাণ্ডের পর স্বজনরা বিচার দাবিতে আইনি লড়াই শুরু করেন। তদন্ত শেষে মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আদালতে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রমও এগোয়। তবে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় মামলার নিষ্পত্তি হয়নি।
একজন সাংবাদিক হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকা নিয়ে সাংবাদিক সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
‘মুকুল ভাই ছিলেন সাহস ও প্রেরণার প্রতীক’
প্রয়াত সম্পাদকের সঙ্গে কাজের স্মৃতিচারণ করে দৈনিক রানারের সাবেক ঢাকা ব্যুরো প্রধান মো. জাকির হোসেন বলেন, মুকুল ছিলেন তাঁদের কাছে শুধু একজন সম্পাদক নন, বরং সাহস ও অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি বলেন, সত্য প্রকাশে মুকুলের দৃঢ়তা এবং সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করত। তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া ছিল গর্বের বিষয়।
জাকির হোসেনের ভাষ্য, মুকুল সাংবাদিকদের শুধু সংবাদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বলতেন না; তিনি সত্য অনুসন্ধান, মানুষের কথা তুলে ধরা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ওপর গুরুত্ব দিতেন। তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল দায়িত্ব পালনের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, একজন সাংবাদিককে হত্যা করে তাঁর জীবন থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও তাঁর আদর্শ ও সত্যের পক্ষে অবস্থান মুছে ফেলা যায় না। মুকুলের সাহসী সাংবাদিকতার শিক্ষা এখনো সহকর্মীদের পথ দেখায়।
আর এম সাইফুল আলম মুকুল হত্যার ২৮ বছর পেরিয়ে গেছে। এত দীর্ঘ সময়েও বিচার শেষ না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে-একজন সাংবাদিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হত্যার শিকার হওয়ার পর ন্যায়বিচারের জন্য তাঁর পরিবারকে এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে কেন?
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা শুধু একটি পরিবারের অপেক্ষাকে দীর্ঘ করে না, বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। বিশেষ করে কোনো সাংবাদিক হত্যার বিচার বিলম্বিত হলে এর সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নও যুক্ত হয়ে যায়।
মুকুল হত্যার বিচার তাই শুধু তাঁর পরিবারের দাবি নয়; এটি সাংবাদিক সমাজেরও দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।
২৮ বছরে সাংবাদিকতার ধরন অনেক বদলেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের পদ্ধতিতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। কিন্তু সত্য প্রকাশ এবং মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব এখনো একই রয়ে গেছে।
সেই কারণেই আজও প্রাসঙ্গিক আর এম সাইফুল আলম মুকুলের সাংবাদিকতার আদর্শ। তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে, কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর অবস্থান হারিয়ে যায়নি।
মুকুলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা, দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। ২৮ বছর আগে থেমে গিয়েছিল একজন অকুতোভয় সম্পাদকের জীবন ও কলম। কিন্তু সত্যের পক্ষে তাঁর যে আদর্শ, তা আজও সাংবাদিকতার অঙ্গনে অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
অরণ্য নিউজ এর পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ-প্রয়াত এই বরেণ্য সাংবাদিক ও নির্ভীক সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুলকে।