শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির আগে ৭২ ঘণ্টা: কীভাবে বদলে গেল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। তবে তার আগে টানা ৭২ ঘণ্টায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায় এবং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়।
২ আগস্ট: আন্দোলনের বিস্তার ও নতুন কর্মসূচি
২ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বড় সমাবেশ হয়। একই দিনে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
সেদিন আন্দোলনের সমন্বয়করা অভিযোগ করেন, তাদের কাছ থেকে চাপ প্রয়োগ করে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি ৩ আগস্ট বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই দিন জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) আন্দোলন ঘিরে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। এছাড়া ঢাকায় শিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে 'দ্রোহ যাত্রা' কর্মসূচি পালিত হয়। সন্ধ্যার দিকে কয়েক ঘণ্টার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টেলিগ্রামে প্রবেশ সীমিত করা হয়।
৩ আগস্ট: এক দফা দাবির ঘোষণা
৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানান। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গণভবনের দরজা খোলা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তবে আন্দোলনের সমন্বয়করা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিন বিএনপিসহ কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দলও সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানায়। একই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।
৪ আগস্ট: সহিংসতা, কারফিউ ও 'মার্চ টু ঢাকা'
৪ আগস্ট শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি। দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের সহিংসতায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার মোবাইল ইন্টারনেটের ফোর-জি সেবা বন্ধ করে দেয় এবং সন্ধ্যা থেকে ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে।
এদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে রাজধানীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে সাবেক কয়েকজন সেনাপ্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান।
৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ ঢাকার দিকে রওনা হন। রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে আন্দোলনকারীরা শহরে প্রবেশ করেন। এদিন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি কার্যকর ছিল।
সকালের দিকে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলেও ক্রমে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। পরে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন-এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও জানায়, তিনি সামরিক বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ভারতগামী হন।
দুপুরে আইএসপিআর ঘোষণা দেয়, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিকেলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আন্দোলনকারীদের প্রবেশ, আওয়ামী লীগের একাধিক কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর, বিভিন্ন থানায় আক্রমণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সেদিন রাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে সংসদ ভেঙে দিয়ে দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
আন্দোলনের মানবিক মূল্য
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়। তবে এই আন্দোলনের সময় সহিংসতায় প্রাণহানি ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। সরকারি হিসাব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য থাকলেও, উভয় পক্ষই উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির বিষয়টি স্বীকার করেছে।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং সেই সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে এখনো গবেষণা, বিশ্লেষণ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি