বন্ধু দিবসে পুরোনো বন্ধুদের জন্য একটি প্রশ্ন-‘কেমন আছিস?
জীবনে এমন একজন বন্ধু থাকুক, যার সামনে নিজেকে বদলে ফেলতে হয় না। যার কাছে কোনো মুখোশের প্রয়োজন পড়ে না। যার সামনে হাসি, কান্না, অভিমান কিংবা দুর্বলতা-সবকিছুই নির্দ্বিধায় প্রকাশ করা যায়। আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবসে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সেই মানুষটির প্রতি, যিনি সময়ের দূরত্ব পেরিয়েও বন্ধুত্বের সংজ্ঞা হয়ে থাকেন।
কত দিন হলো আড্ডার টেবিলে বসা হয় না? ক্লাবঘরের সেই তাসের আসর, ক্যারামের গুটি কিংবা একসঙ্গে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার দিনগুলো যেন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমে রাতভর গান, বৃষ্টিভেজা বিকেলে ফুটবল, ছুটির দিনে দল বেঁধে সিনেমা দেখা-সবই এখন স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি।
আজ শহরে বৃষ্টি নামলেও আর বন্ধুদের ফোন আসে না, "চল, বের হই।" মন খারাপের দিনে জানালার পাশে বসে থাকলেও পাশে বসে চায়ের কাপ এগিয়ে দেওয়ার মানুষটি যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। প্রশ্ন জাগে-বন্ধুরা কি সত্যিই হারিয়ে যায়, নাকি জীবনই আমাদের আলাদা পথে নিয়ে যায়?
সময় বদলায়, বন্ধুত্বও বদলায়
শৈশবের প্রথম বন্ধু হয় প্রতিবেশী। এরপর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়-প্রতিটি ধাপে নতুন নতুন মানুষ যোগ হয় জীবনে। কেউ হয়ে ওঠে হাসির সঙ্গী, কেউ দুঃসময়ের আশ্রয়, কেউবা স্বপ্ন ভাগাভাগির মানুষ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় জীবনের অগ্রাধিকার। চাকরি, সংসার, দায়িত্ব আর ব্যস্ততা ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি করে। যে বন্ধু ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করা যেত না, একসময় তার সঙ্গে মাসের পর মাস কথা হয় না।
তবু কি বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায়?
জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে বন্ধুত্বকে তুলনা করেছিলেন সমুদ্রে ভেসে চলা জাহাজের সঙ্গে। কিছু জাহাজ দীর্ঘ সময় পাশাপাশি চলে, আবার কোনো একসময় ভিন্ন স্রোতে ভেসে যায়। তাই দূরত্ব মানেই সম্পর্কের মৃত্যু নয়; অনেক সময় সেটিই জীবনের স্বাভাবিক গতি।
দূরত্ব নয়, স্মৃতিই বন্ধুত্বের ঠিকানা
ধরা যাক, বহু বছর পর হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে গেল শৈশবের বন্ধুর সঙ্গে। হয়তো সে আজ তরমুজ বিক্রি করছে, আর আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা করপোরেট কর্মকর্তা। মুহূর্তেই দুজনের চোখে ভেসে ওঠে কাদামাটির মাঠ, মার্বেল খেলা, গাছে চড়া আর স্কুল পালানোর দিনগুলো।
সেই মুহূর্তে পেশা, অবস্থান কিংবা সামাজিক পরিচয় বড় হয়ে ওঠে না। বড় হয়ে ওঠে একসঙ্গে কাটানো শৈশব।
বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই-এটি পদবি দেখে নয়, মানুষকে দেখে।
সব বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত থাকে না
সবাই আমাদের জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত পাশে থাকবে-এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষ বদলায়, চিন্তা বদলায়, জীবন বদলায়। কেউ সামনে এগিয়ে যায়, কেউ অন্য পথে হাঁটে, কেউ আবার সময়ের ভিড়ে হারিয়ে যায়। তাতে বন্ধুত্বের মূল্য কমে না। বরং জীবনের যে সময়ে যে মানুষটি আমাদের পাশে ছিল, সেই উপস্থিতিই আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনের অংশ হয়ে থাকে।
বন্ধুত্ব কখনো শুধু একসঙ্গে থাকা নয়; কখনো কখনো দূরে থেকেও একজন আরেকজনের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা।
আজই খোঁজ নিন সেই বন্ধুর
বন্ধু দিবস কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার উপলক্ষ নয়। এটি সেই মানুষটির খবর নেওয়ার দিন, যার সঙ্গে অনেক দিন কথা হয়নি। হয়তো একটি ফোনকল, একটি বার্তা কিংবা একটি ছোট্ট প্রশ্ন-"কেমন আছিস?"-আবার ফিরিয়ে আনতে পারে বহু বছরের দূরত্ব। সময় বদলাবে, মানুষ বদলাবে, জীবনও নতুন পথে হাঁটবে। তবু বন্ধুত্ব যেন কখনো হারিয়ে না যায়।
হয়তো একদিন বহু বছর পর আবার দেখা হবে। কাঁধে হাত রেখে সে হেসে বলবে-"কেমন আছিস?" আর সেই একটি প্রশ্নই ফিরিয়ে আনবে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, অসমাপ্ত আড্ডা আর অগণিত স্মৃতি। বন্ধু দিবসে সেই সব বন্ধুদের প্রতি রইল অশেষ ভালোবাসা-যারা কাছে থাকুক কিংবা দূরে, হৃদয়ের একটি জায়গা আজও নিঃশব্দে দখল করে আছে।