অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থে ভারত-চীনের সঙ্গে সর্ম্পকোন্নয়নে ঢাকা
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাও আরও বিস্তৃত করার পথে এগোচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপে এই দ্বিমুখী কৌশলের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই ছিল তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফর। পর্যবেক্ষকদের মতে, সফরের গন্তব্য নির্বাচন বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে চীন সফরকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার নবনির্বাচিত নেতাদের প্রথম বিদেশ সফরের প্রধান গন্তব্য ছিল ভারত। সে বিবেচনায় চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে দিল্লিতে কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। বিশেষ করে আগের সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই সফর নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করছে বলে তাঁদের মত।
চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা ও সহযোগিতা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহযোগিতা এবং মোংলা বন্দরের কাছে চীনের সহায়তায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ দুটি বিষয়ই ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উভয় দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সীমান্ত বাণিজ্য ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হয়েছে এবং দেড় বছরের বিরতির পর সীমিত পরিসরে আন্তঃদেশীয় বাস চলাচলও শুরু হয়েছে।
চলতি বছরের জ্বালানি সংকটের সময় ভারত জরুরি ভিত্তিতে ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ করে। পাশাপাশি ঢাকায় নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণকেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থান, সীমান্তে অনিয়মিত প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন বক্তব্য ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা সম্পর্ককে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে দিচ্ছে না বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ ভারতের জন্য সংবেদনশীল নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুই দেশ অভিন্ন নদীটির পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। এ অবস্থায় নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সিদ্ধান্ত দিল্লির নজরে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা অববাহিকার পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার, খনন ও পলি অপসারণের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের দাবি, অতীতেও ভারতকে এ ধরনের প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এদিকে বেইজিং জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং এ ধরনের সম্পর্ককে অন্য কোনো পক্ষের প্রভাবমুক্ত রাখা উচিত।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে সবচেয়ে বড় সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ চীন। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পেও দেশটির উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সফরে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাবও আলোচনায় আসে, যা আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-ভারত ও চীনের মতো দুই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত বাস্তবতা বিবেচনায় উভয় দেশের সঙ্গেই কার্যকর অংশীদারত্ব বজায় রাখা ঢাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।