রামিসা হত্যা মামলার রায় আজ, অপেক্ষায় পুরো দেশ
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার রায় আজ (রোববার) ঘোষণা করা হবে। ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে এ মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত রয়েছে।
গত ১৯ মে মিরপুরের পল্লবী এলাকায় নিজ বাসার কাছ থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, তাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে বিভিন্ন মহল সোচ্চার হয়।
ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সময়ে আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। পরদিন নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত চলাকালে ডিএনএ নমুনা, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তদন্তকারী সংস্থা। পরে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণের পর মামলাটি বিচারের জন্য শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপক্ষের তালিকাভুক্ত ১৭ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।
সাক্ষীদের মধ্যে নিহত শিশুর পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়। এ সময় সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অপর আসামি স্বপ্না আক্তারও অভিযোগ অস্বীকার করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য উপাদানের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই দুই আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, মামলার বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণ একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা অভিযুক্তদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠা করে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তদন্তে কিছু ঘাটতি রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তারের বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আসামিদের খালাস চেয়ে আবেদন জানান। বিকল্পভাবে প্রধান আসামির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর আসামির ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সাজা দেওয়ার অনুরোধ করেন।
মামলাটির বিশেষ দিক হলো, মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্কসহ পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে এত দ্রুত বিচারিক অগ্রগতি খুবই বিরল।
রায়ের আগে এক আলোচনায় রামিসার বাবা বলেন, তিনি শুধু নিজের মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার চান না; একই সঙ্গে এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা দেখতে চান, যেখানে কোনো শিশুকে আর এ ধরনের নির্মম ঘটনার শিকার হতে না হয়।