অশ্রুসিক্ত বিদায়, সাংবাদিক দেবাশীষ ও পরিবারের চারজনের শেষকৃত্য-দাফন সম্পন্ন
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণাশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেনের শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় ৯১ ঘণ্টা পর শনিবার রাতে তাঁদের মরদেহ কুষ্টিয়ায় পৌঁছালে স্বজন, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকা। একই পরিবারের চারজনের মরদেহ একসঙ্গে দেখে শোকে ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চারজনের মরদেহ কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া বাহাদুর আলী বিশ্বাস সড়কের বাড়িতে পৌঁছায়। খবর পেয়ে সেখানে জড়ো হন স্বজন, প্রতিবেশী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ের কারণে বাড়িতে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা সম্ভব না হওয়ায় পরে মরদেহগুলো আড়ুয়াপাড়া তরুণ সংঘ পাঠাগার ক্লাব চত্বরে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে শেষবারের মতো স্বজনদের দেখানোর জন্য দেবাশীষের মরদেহ তাঁর বাড়িতে নেওয়া হয়।
পরে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে চারজনের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।
রাতে সৎকার ও দাফন
রাত ১টার দিকে কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর তিন বছরের ছেলে স্বর্ণাশীষ দত্তের সৎকার সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে রাত আড়াইটার দিকে কুষ্টিয়া মডেল মসজিদে আফসানা শারমীন ও তাঁর বাবা আকরাম হোসেনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে তাঁদের মরদেহ কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়। দেবাশীষের শেষ বিদায়ে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন তাঁর সহকর্মী সাংবাদিকরা। প্রিয় সহকর্মীর কফিন দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছোট্ট পাখির কান্না
চারজনের শেষ বিদায়ের পুরো আয়োজনজুড়ে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল ছোট্ট পাখির কান্না। বাবা-মা, ছোট ভাই ও নানুর মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি। কয়েক দিন ধরে বাবা-মায়ের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিল পাখি। তার বিশ্বাস ছিল, বিদেশ থেকে ফেরার সময় বাবা-মা তার জন্য খেলনা, চকলেট ও নতুন পোশাক নিয়ে আসবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার পর স্বজনরা দেশে ফিরেছেন নিথর চারটি দেহ নিয়ে।
কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে মরদেহগুলোর অবস্থা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক স্বজনই শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখতে পারেননি। স্বজন হারানোর বেদনার সঙ্গে এই বাস্তবতা শোককে আরও গভীর করেছে।
ধর্মের ভিন্নতা বাধা হয়নি সংসারে
পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রায় ১১ বছর আগে পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ দত্ত ও আফসানা শারমীন। দেবাশীষ ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং আফসানা ছিলেন মুসলিম। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় হলেও বিয়ের পর কেউ কাউকে ধর্ম পরিবর্তনের জন্য চাপ দেননি। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি মেনেই সংসার করছিলেন তাঁরা।
চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে দেশে ফেরার আগেই কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে স্বামী-স্ত্রী, তাঁদের শিশুসন্তান এবং আফসানার বাবা আকরাম হোসেনের মৃত্যু হয়।
স্টার নিউজের কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি জহুরুল ইসলাম বলেন, দেবাশীষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। সহকর্মীর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেবাশীষ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এখন তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু বলেন, একজন সহকর্মী হিসেবে দেবাশীষের সঙ্গে তাঁদের অনেক স্মৃতি রয়েছে। কফিনবন্দী হয়ে তাঁকে ফিরতে হবে-এমনটি কখনো কল্পনা করেননি তাঁরা।
তিনি বলেন, একই পরিবারের চারজনের একসঙ্গে চলে যাওয়া শুধু স্বজনদের নয়, পুরো কুষ্টিয়ার মানুষের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি। দেবাশীষের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এখন সবার দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সাংবাদিক সমাজসহ সামর্থ্যবানদের পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
প্রশাসনের সহায়তা
নিহতদের শেষকৃত্য ও দাফনের সময় পরিবারের পাশে ছিল কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশিদ জানান, জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ দুই পরিবারকে মোট এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার কথা ছিল
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ৩ আগস্ট স্ত্রী আফসানা শারমীন ও সন্তানদের নিয়ে ভারতে যান সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ১৮ আগস্ট রাতে তাঁরা কলকাতায় পৌঁছান। পরে নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন তাঁরা। পরদিন ১৯ আগস্ট তাঁদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নেয় একই পরিবারের চারজনের প্রাণ।
ঘটনার পর অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা কর্তৃপক্ষ। একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ায় এখনো শোকের আবহ বিরাজ করছে। স্বজনদের কান্না, সহকর্মীদের অশ্রুসিক্ত চোখ আর ছোট্ট পাখির অপেক্ষা যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে কলকাতার সেই ভয়াবহ রাতের নির্মম পরিণতি। চিকিৎসা শেষে হাসিমুখে দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁদের; শেষ পর্যন্ত ফিরতে হলো চারটি নিথর দেহ হয়ে।