বিদ্যুৎ খাতে রাতারাতি সমাধান নয়, প্রয়োজন সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা ও কঠোর নজরদারি
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে চলমান আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে কাউকে ঘিরে অযৌক্তিক প্রত্যাশা তৈরি করে পরে তাকেই ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা যুক্তিসংগত নয়। তারেক রহমান কোনো জাদুকর নন যে রাতারাতি দীর্ঘদিনের সব সমস্যা সমাধান করে দেবেন। একটি বৃহৎ ও জটিল খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক, পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
আমার বিবেচনায় উন্নয়নের কার্যকর কাঠামো হওয়া উচিত-System > Process > Activities। অর্থাৎ প্রথমে একটি কার্যকর সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সেই সিস্টেমের অধীনে সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে এবং এরপর পরিকল্পিতভাবে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শক্তিশালী ও সমন্বিত সিস্টেমের ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। শুধু ‘উন্নয়ন’ নিয়ে প্রচার চালালেই বাস্তব উন্নয়ন প্রতিষ্ঠিত হয় না।
বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যেসব প্রকল্প ও কার্যক্রম চলমান রয়েছে, সেগুলোর জন্য কার্যকর Standard Operating Procedure (SOP) বা প্রমিত কার্যপদ্ধতি নিশ্চিত করা জরুরি। কোন কাজ কীভাবে, কোন ধাপে, কার দায়িত্বে এবং কীভাবে তার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে-এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। প্রকল্পগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আওতায় এনে প্রতিটি কার্যক্রম নিয়মিত ও কঠোরভাবে মনিটরিং করা গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
একই সঙ্গে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য উৎপাদন উৎস থেকে সক্ষমতা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং বিশেষ সুপারিশের ভিত্তিতে দেওয়া সংযোগগুলো নিয়ম ও প্রয়োজনের আলোকে পর্যালোচনা করাও জরুরি।
দেশব্যাপী অবৈধ অটোরিকশা চার্জিং স্টেশন শনাক্ত করা, মিটার টেম্পারিং ও বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা এবং সামগ্রিক বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা দরকার। পাশাপাশি কোথায় বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে, কোথায় সিস্টেম লস বেশি এবং কোন পর্যায়ে অনিয়ম হচ্ছে-এসব বিষয় তথ্যভিত্তিকভাবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বিদ্যুৎ খাতে দৃশ্যমান সুফল পাওয়া সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে এ জন্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তারেক রহমানকে সামনে রেখে শুধু স্লোগান বা রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তব কাজের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিটি পর্যায়কে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকরভাবে সাজাতে হবে। দুর্নীতি ও অবৈধ উপার্জনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তদন্তসাপেক্ষে আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ আগামী দিনে শুধু বক্তৃতা দিয়ে উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়; কাজের মাধ্যমেই উন্নয়নের প্রমাণ দিতে হবে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা থাকবে-বক্তব্য ও বিবৃতির চেয়ে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে একটি কার্যকর কাঠামোর মধ্যে এনে সেগুলোর বাস্তবায়ন, অগ্রগতি মূল্যায়ন ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হওয়ার পরিবর্তে বাস্তব কাজের ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা অধিক কার্যকর হবে।
আমরা আশাবাদী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কৌশল, পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করতে পারবেন এবং খাতটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন। তবে তাদের কাজ করার যৌক্তিক সময় ও সুযোগও দিতে হবে। ক্ষমতায় আসার মাত্র পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যেই গ্রীষ্মকালীন বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা শতভাগ সামাল দেওয়া যাবে-এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
সরকার কী করছে, কোন প্রকল্প কতদূর এগিয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে-এসব বিষয় তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। অযথা অভিযোগ করে সংশ্লিষ্টদের বিব্রত করার পরিবর্তে সংকটকালে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কী ভূমিকা রয়েছে, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ব্যবহারে নাগরিক সচেতনতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বেশি বিল দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা উচিত নয়। একজনের অতিরিক্ত ব্যবহার অন্য একজনের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ব্যক্তিস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ-দুটিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যেক নাগরিকের বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া প্রয়োজন।
আগামী মৌসুম বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কার্যক্রম মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে পারে। তখন দেখা প্রয়োজন-চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কতগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, কতগুলো চলমান এবং বাস্তবে কতটুকু অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
সেই ফলাফলের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা যাবে, তারেক রহমান দেশ পরিচালনায় তার টিমকে কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত করেছেন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কতটুকু প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তার আগে অনুমাননির্ভর ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা অতি প্রত্যাশার পরিবর্তে বাস্তব কাজ, অগ্রগতি ও ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই হবে অধিক যুক্তিসংগত।
মো. আশরাফ-উদ-দৌলা
লেখক ও কলামিস্ট