মির্জা ফখরুলের আসনে বিএনপির হাল ধরবেন কে-ভাই নাকি মেয়ে?
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের পর শূন্য হয়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি ঠাকুরগাঁও-১ আসন। নিয়ম অনুযায়ী, শিগগিরই এ আসনে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। তবে তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ।
মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে তাঁর ছোট ভাই, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মির্জা ফয়সাল আমিন এবং বড় মেয়ে শামারুহ মির্জার নাম। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখতে বিএনপি শেষ পর্যন্ত ভাইকে বেছে নেবে, নাকি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী মেয়েকে সামনে আনবে?
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হতে পারে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে মির্জা ফখরুলের মতামতও প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করছেন দলের স্থানীয় নেতারা।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি মির্জা পরিবারের
ঠাকুরগাঁও সদর, ভুল্লি ও রুহিয়া নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে মির্জা পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত। মির্জা ফখরুলের বাবা প্রয়াত মির্জা রুহুল আমিনও এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। আইনজীবী মির্জা রুহুল আমিন পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার দুই মেয়াদে সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য হন এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভাতেও দায়িত্ব পালন করেন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অনুসরণ করেই পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন মির্জা ফখরুল।
১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এরপর দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে তিনি বিএনপির মহাসচিব হন।
সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর ফলে তাঁর ছেড়ে যাওয়া আসনে নতুন মুখ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
আলোচনায় ফয়সাল আমিন
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা মির্জা ফয়সাল আমিন বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। এর আগে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জেলা ও সদর উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সরাসরি যোগাযোগ ফয়সাল আমিনের অন্যতম বড় শক্তি। আন্দোলন-সংগ্রাম ও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে দলের অনেক নেতাকর্মী তাকে পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তাদের মতে, উপনির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে সাংগঠনিক কাঠামো দ্রুত সক্রিয় করা এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় ফয়সাল আমিন এগিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকেরা।
তবে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন কেউ কেউ। ফলে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা শামারুহ মির্জা
অন্যদিকে সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় না থাকলেও মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে শামারুহ মির্জার নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং সেখানে শিক্ষকতাও করেছেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত।
স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, করোনাকালে এবং ঠাকুরগাঁওয়ের অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তায় শামারুহের ভূমিকা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করেছে। নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাবা মির্জা ফখরুলের পক্ষে প্রচারণায় মাঠে সক্রিয় ছিলেন শামারুহ। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতিও আগের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শামারুহকে প্রার্থী করা হলে বিএনপিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনার একটি বার্তা যাবে বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকেরা। তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে বলেও তাদের ধারণা।
সিদ্ধান্ত তফসিলের পর
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তফসিল প্রকাশের পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত নেওয়া হতে পারে। এরপর দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
ফলে এখন পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, তা নিশ্চিত নয়। তবে ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং মেয়ে শামারুহ মির্জার নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব-দুই দিকের হিসাবই বিএনপির মনোনয়ন সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।