তিন মাসের বিরতির পর মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) পর্যটকদের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবন। দীর্ঘদিন পর বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমিতে ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে পর্যটকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ।
তবে সুন্দরবন ভ্রমণ অন্য যেকোনো পর্যটন গন্তব্যের চেয়ে কিছুটা আলাদা। বনে প্রবেশের অনুমতি, নির্ধারিত পর্যটন এলাকা, নৌযান, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও বন বিভাগের বিধিনিষেধ সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা থাকা জরুরি। ভ্রমণ পরিকল্পনার সুবিধার্থে জেনে নিন গুরুত্বপূর্ণ ১২টি তথ্য।
১. কোন পথে সুন্দরবনে যাবেন
সুন্দরবনে প্রবেশের প্রধান পথগুলোর মধ্যে রয়েছে খুলনা, বাগেরহাটের মোংলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর। তবে লঞ্চ বা জাহাজে দীর্ঘ ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে সাধারণত খুলনা ও মোংলা থেকেই যাত্রা করা হয়।
২. ইচ্ছেমতো বনে প্রবেশ করা যাবে না
সুন্দরবনের প্রতিটি এলাকায় পর্যটকদের অবাধে প্রবেশের সুযোগ নেই। বন বিভাগের অনুমতি বা বৈধ পাস নিয়ে নির্ধারিত রুট ও পর্যটন স্পটে যেতে হয়। কিছু এলাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বা বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে।
৩. ঢাকা থেকে যাতায়াতের খরচ
ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি খুলনা ও মোংলায় যাওয়া যায়। খুলনাগামী নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ট্রেনেও ঢাকা থেকে খুলনায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর ঢাকা থেকে মোংলা পর্যন্ত নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৭০০ টাকা।
৪. কোথায় পাবেন নৌযান
সুন্দরবন ঘুরে দেখার জন্য মোংলা, খুলনার চালনা এবং সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ট্রলার ও নৌযান পাওয়া যায়। এক দিনের ভ্রমণে মোংলা থেকে পশুর নদ হয়ে করমজল ও হাড়বাড়িয়া, খুলনা থেকে রূপসা-শিবসা নদীপথে কালাবাগী ও শেখেরটেক এবং মুন্সিগঞ্জ থেকে কলাকাছিয়া ও দোবেকী যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
৫. প্যাকেজ ট্যুরে কী থাকে
ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সুন্দরবন ভ্রমণ করলে সাধারণত বন বিভাগের বিভিন্ন ফি, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এক দিনের সফরে গেলে পর্যটন স্পট অনুযায়ী আলাদা প্রবেশ ফি দিতে হতে পারে।
৬. এক দিনেই করমজল-হাড়বাড়িয়া
মোংলা থেকে ভোরে যাত্রা শুরু করলে এক দিনের মধ্যে করমজল ও হাড়বাড়িয়া ঘুরে দেখা সম্ভব। মোংলা ফেরিঘাট থেকে সারা দিনের জন্য নৌযান ভাড়া নেওয়া যায়। শুধু করমজল ঘুরতে নৌযানের জন্য আনুমানিক ১ থেকে ২ হাজার টাকা লাগতে পারে। করমজলের সঙ্গে হাড়বাড়িয়া যুক্ত করলে ভাড়া প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা হতে পারে। এক দিনের সফরে খাবার সঙ্গে নেওয়া সুবিধাজনক।
৭. ইকোকটেজে রাত কাটানোর সুযোগ
সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাসগঞ্জ ও বানীশান্তা ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি ইকোকটেজ গড়ে উঠেছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে সুন্দরবনের পরিবেশ উপভোগ করতে অনেক পর্যটক এসব কটেজে থাকেন। মোংলা কিংবা খুলনা থেকে মোংলা বা চালনা হয়ে সেখানে যাওয়া যায়।
৮. পর্যটকদের জন্য রয়েছে প্রায় ৬৫ জলযান
খুলনা থেকে সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য বর্তমানে প্রায় ৬৫টি জলযান রয়েছে। এসব নৌযানের ধারণক্ষমতা ভিন্ন। কোনো কোনো নৌযানে ৬ জনের মতো পর্যটক যেতে পারেন, আবার বড় জলযানে সর্বোচ্চ প্রায় ৭৫ জন ভ্রমণ করতে পারেন।
৯. জনপ্রিয় তিন দিন দুই রাতের প্যাকেজ
সুন্দরবনে সাধারণত তিন দিন দুই রাতের ট্যুর বেশি আয়োজন করা হয়। কোনো ট্যুর কোম্পানির সঙ্গে বুকিং করলে অনেক ক্ষেত্রে মোট খরচের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আগাম পরিশোধ করতে হয়। উৎসব, সরকারি ছুটি ও দীর্ঘ ছুটির সময়ে পর্যটকের চাপ বেড়ে যায়। তাই এ সময় সুন্দরবন ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে আগেভাগে বুকিং করাই ভালো।
১০. জনপ্রতি খরচ কত
নন-এসি জলযানে সুন্দরবন ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। এসি জলযানের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ব্যয় প্রায় ১৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
১১. প্যাকেজের মধ্যে সাধারণত যা থাকে
ট্যুর প্যাকেজের নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে সাধারণত বন বিভাগের অনুমতি ও প্রবেশসংক্রান্ত ফি, থাকা, গাইড এবং সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবারসহ দুটি স্ন্যাকস থাকে।
অর্থাৎ নৌযানে ওঠার পর থেকে সুন্দরবন ঘুরে ফেরার পুরো যাত্রার অধিকাংশ মৌলিক খরচই প্যাকেজের আওতায় থাকে।
১২. বন বিভাগের নিয়ম অবশ্যই মানতে হবে
সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হয়। বনে ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েও সুন্দরবনে প্রবেশ করা যায় না। এ ছাড়া পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে-এমন সামগ্রী বা কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হবে। ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের গ্লাস, প্লেটসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী বনে না নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বনের প্রাণী ও পাখিদের স্বাভাবিক চলাচলে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না করা। সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্বও পর্যটকদের নিতে হবে।