দক্ষিণ এশিয়ায় শিশু অপুষ্টির সংকট শুধু খাবারের অভাবের ফল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, দুর্বল অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব। পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সংকট আর আফগানিস্তানে পরিবেশগত বিপর্যয়—দুই ভিন্ন বাস্তবতায় একইভাবে ঝুঁকিতে পড়ছে লাখো শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ও ভবিষ্যৎ।
সাম্প্রতিক দুটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, অপুষ্টি শুধু শিশুদের শারীরিক বিকাশেই বাধা দিচ্ছে না; দীর্ঘমেয়াদে তা দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পাকিস্তানে অপুষ্টির পেছনে দারিদ্র্যের বড় ভূমিকা
পাকিস্তানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশ বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশটির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ও অর্থনীতিতে। প্রতিবছর শিশুদের অপুষ্টিজনিত এই অপূরণীয় ক্ষতির কারণে পাকিস্তান প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হারাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ‘অ্যাক্ট ফর নিউট্রিশন’ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নীতিনির্ধারক ও পুষ্টিবিদরা। তাদের মতে, পাকিস্তানের অপুষ্টি সংকটকে কেবল স্বাস্থ্যসেবা বা খাদ্য সহায়তার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে অর্থনৈতিক নীতি, দারিদ্র্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের।
ইসলামাবাদের ‘দ্য ফ্রাইডে টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক শিশুর অপুষ্টির শুরু হচ্ছে জন্মের আগেই। মায়ের নিজের পুষ্টির ঘাটতি, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না থাকা এবং পরিবারের সীমিত আয় গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গ্রামীণ পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অনেক নারী নিজেদের পরিবারের জন্য উৎপাদিত বা কেনা ডিম না খেয়ে বাজারে বিক্রি করে দেন। সেই অর্থ দিয়ে পরিবারের জন্য আটা, তেল ও সবজির মতো প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা হয়। ফলে পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে চা-বিস্কুটের মতো কম পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার ঘাটতি নয়; বরং চরম আর্থিক সংকটের ফল।
দুধ উৎপাদনে এগিয়ে, তবু পুষ্টিতে পিছিয়ে
পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম বড় দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ হলেও এর বড় অংশই আধুনিক প্রক্রিয়াজাত ও বাজারব্যবস্থার আওতায় আসে না। অনানুষ্ঠানিক ও মধ্যস্বত্বভোগীনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে গ্রামীণ উৎপাদকরা অনেক সময় তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
ফলে দেশে খাদ্য উৎপাদন থাকলেও দরিদ্র পরিবারের মানুষের কাছে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দুর্বল বাজারব্যবস্থা শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আফগানিস্তানে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ
পাকিস্তানের মতো অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি প্রতিবেশী আফগানিস্তানেও শিশু অপুষ্টির পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে অনিয়মিত আবহাওয়া, খরা ও অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয় খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, আফগানিস্তানে শিশুদের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, খাদ্যসংকট ও দুর্বল আর্থসামাজিক পরিস্থিতি শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় অপুষ্টি মোকাবিলায় শুধু খাদ্য সরবরাহ বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দরকার দারিদ্র্য কমানো, মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, কৃষক ও উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
কারণ আজকের অপুষ্ট শিশুরাই আগামী দিনের শ্রমশক্তি। তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের ওপর নয়, পুরো দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ওপর পড়বে।