ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন ছুটছে ব্যাটারি ও মোটরচালিত তিন চাকার অসংখ্য যান। সর্বোচ্চ ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম এসব যানের অনেকগুলোর খালি ওজনই ১০০ কেজির বেশি। চালক ও যাত্রী উঠলে ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কেজি। অথচ এমন ভারী ও দ্রুতগতির যান থামাতে কোথাও কোথাও ব্যবহার করা হচ্ছে সাধারণ প্যাডেলচালিত রিকশার ব্রেক প্যাড যার বাজারমূল্য মাত্র ৩০ টাকা।
দেশে বর্তমানে ৮০ লাখের বেশি অটোরিকশা ও অটোভ্যান চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত এই খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। তবে অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং সড়কে বিশৃঙ্খল চলাচলের কারণে এসব যান এখন সড়ক নিরাপত্তার বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে গত সোমবার জামালপুরের সদর উপজেলার লাহেরীকান্দা এলাকায় বাসের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৬ জন। দুর্ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে অনিরাপদভাবে পরিচালিত ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ঝুঁকি।
শিশু পরিবহনেও ঝুঁকিপূর্ণ ভ্যান
ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি দেখা যাচ্ছে শিশুদের পরিবহনে ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত ভ্যানগুলোতে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ছুটির পর এসব ভ্যানে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। কোথাও স্কুল কর্তৃপক্ষ, আবার কোথাও অভিভাবকেরা ভাড়া করে এসব যান ব্যবহার করছেন।
সাধারণত দুই পাশে বেঞ্চ এবং চারপাশে লোহার খাঁচার মতো কাঠামো থাকা এসব ভ্যানে চারটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটর সংযুক্ত থাকে। ফলে শিশুদের পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত যানগুলোও যথেষ্ট ভারী ও গতিসম্পন্ন হয়ে উঠছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে অটোরিকশা ও অটোভ্যান দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৬০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নছিমন, ভটভটি, আলমসাধু, মাহিন্দ্র ও টমটমসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন আরও ২ হাজার ৪৬৫ জন।
সংস্থাটির হিসাবে, দেশে ৮০ লাখের বেশি অটোরিকশা রয়েছে। এসব যান পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক পরিবার যুক্ত।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে কারিগরি কমিটির মধ্যে সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তব পরিস্থিতির জরিপ জরুরি। একই সঙ্গে অটোরিকশার জন্য নিরাপদ ও অভিন্ন নকশা নির্ধারণ, সঠিকভাবে নিবন্ধন এবং চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ, বাস্তবায়নে বাধা
সাইদুর রহমানের মতে, একদিকে মহাসড়কে অটোরিকশা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে এসব যান ও যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা এবং কারখানায় উৎপাদনও অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নীতিতে এই অসামঞ্জস্যের কারণে অনেকে ঋণ নিয়ে অটোরিকশা কিনে পরে আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
ঢাকার বনানী এলাকায় রিকশাচালক জামাল হোসেনের অভিজ্ঞতাও এই সংকটের আরেকটি দিক তুলে ধরে। দীর্ঘ ৩৮ বছর রিকশা চালানো জামাল মনে করেন, সামান্য খরচ কমানোর জন্য যাত্রীরা অনেক সময় মোটরচালিত রিকশা বেছে নেন। কিন্তু যাত্রাটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদ হবে কি না, সেই বিষয়টি অনেকেই বিবেচনায় নেন না।
কুড়িগ্রামের ষাটোর্ধ্ব রিকশাচালক আবুল বাশারও দীর্ঘদিন ধরে প্যাডেলচালিত রিকশা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে মালিকদের জন্য গড়ে উঠেছে ভাড়াভিত্তিক লাভজনক ব্যবসা। চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্যাডেলচালিত রিকশায় দৈনিক জমা যেখানে প্রায় ১৮০ টাকা, সেখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় জমার পরিমাণ প্রায় ৪০০ টাকা।
জামাল হোসেনের মালিক সিদ্দিকের ১০টি অটোরিকশা রয়েছে। প্রতিটি থেকে দৈনিক জমা হিসেবে তার আয় প্রায় ৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে আবুল বাশারের মালিক জসিমের রয়েছে প্রায় ৪০টি প্যাডেল রিকশা, যেগুলো থেকে প্রতিদিন তার আয় হয় প্রায় ৭ হাজার ২০০ টাকা। উভয় মালিকের গ্যারেজই মহাখালীর ওয়্যারলেস এলাকায়।
‘মান্থলি’ ও টোকেনের অভিযোগ
দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সেন্টু বেপারির দাবি, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা চলাচলে নিয়ম ও পুলিশের নজরদারিতে ভিন্নতা রয়েছে। তার অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে মাসিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিশেষ টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। ওই টোকেন থাকলে নির্দিষ্ট এলাকায় অটোরিকশা চালানোর সুযোগ পাওয়া যায়। টোকেন না থাকলে যানবাহন জব্দ করে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।
ব্যাটারি ব্যবসায় শতকোটি টাকার ভ্যাটের অভিযোগ
অটোরিকশার বিস্তারের সঙ্গে দ্রুত বড় হয়েছে ব্যাটারির বাজারও। ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জিউঝু ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ৪৯৩ কোটি ২৬ লাখ ৪ হাজার ৩৪৩ টাকার বিক্রি কম দেখিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি ইজি বাইক, রিকশা ও অটোভ্যানের জন্য ড্রাই ও ওয়াটার ব্যাটারি উৎপাদন করে।
গ্যারেজ মালিক ও চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার তুরাগের রানাভোলা, টঙ্গীর চেরাগালি এবং জয়দেবপুর কোর্ট-কাঁচারি এলাকায় থাকা বিভিন্ন অননুমোদিত কারখানা থেকেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাটারি সরবরাহ করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশ থেকে প্রস্তুত ব্যাটারি আমদানির ক্ষেত্রে করের হার কাঁচামাল বা কাঁচা সিসা আমদানির তুলনায় অনেক বেশি। এই ব্যবধান স্থানীয়ভাবে কম খরচে ব্যাটারি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করছে, ফলে সস্তা ব্যাটারির বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে।
পুরোনো ব্যাটারির বর্জ্যেও বাড়ছে ঝুঁকি
ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশের ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার টন পুরোনো ব্যাটারি বর্জ্য তৈরি হয়। এর উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অনুরূপ যানবাহনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৩৮ শতাংশের রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগে এই হার ৬৫ শতাংশেরও বেশি।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় সিসা দূষণের কারণে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগজনিত অকালমৃত্যুর ঝুঁকির কথাও উঠে এসেছে।
আদালতের নির্দেশেও কমেনি চলাচল
ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে হাইকোর্ট ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারি ও মোটরচালিত রিকশার চলাচল নিয়ে নির্দেশনা দেন।
এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা থেকে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান সরানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে চালকদের আন্দোলনের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়।
একই বছরের নভেম্বরে হাইকোর্ট ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ পরবর্তী সময়ে এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করেন।
২০২৫ সালের মে মাসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশ ব্যাটারিচালিত রিকশাকে অভ্যন্তরীণ ও সার্ভিস সড়কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নেয়। অভিযানে শতাধিক রিকশা জব্দও করা হয়। তবে চালকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও আন্দোলনের কারণে সেই উদ্যোগও বড় বাধার মুখে পড়ে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন প্যাডেলচালিত রিকশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন ও নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবিও জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন তিনি।
উৎপাদন পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামসুল হক মনে করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার সমস্যা মূলত সরকারের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তার মতে, ঢাকাকে অঞ্চলভিত্তিক রিকশা চলাচলের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে শহরের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। সিটি করপোরেশন সীমিতসংখ্যক রিকশার অনুমোদন দিলেও বাস্তবে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যান চলছে। তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা।
তিনি চালকদের নিবন্ধন, পরিচয়পত্র, নির্দিষ্ট পোশাক বা ভেস্ট এবং বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরামর্শ দেন।
ড. শামসুল হকের মতে, ঢাকার প্রধান সড়কে ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল বন্ধ করে গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। তবে শাখা সড়ক ও গলিতে সীমিত আসনের নিয়ন্ত্রিত যানবাহন রাখা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সমস্যার অন্যতম মূল উৎস হচ্ছে অটোরিকশার অবাধ উৎপাদন ও ব্যাটারি সরবরাহ। তাই শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে বা যানবাহন ডাম্পিং করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; উৎপাদন পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ চুরি করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ বন্ধ করা গেলে পরিচালন ব্যয় বাড়বে এবং এই যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার কিছুটা কমতে পারে।
তার পরামর্শ, কৃষিখাতের জন্য ভর্তুকিতে আমদানি করা ব্যাটারি যাতে বাণিজ্যিক কাজে বা অটোরিকশায় ব্যবহার না হয়, সেটিও কঠোরভাবে নজরদারি করা প্রয়োজন।