দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্থিতিশীল সরবরাহ উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস পেশাজীবী মো. আশরাফ-উদ-দৌলা।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) অরণ্য নিউজের কাছে পাঠানো এক বিশ্লেষণে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, নিটওয়্যার, ডাইং–ফিনিশিং, চামড়া, সিরামিক, ওষুধ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট এ শিল্পভিত্তিকে গভীর চাপের মুখে ফেলেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। বিশেষ করে পোশাক খাতের স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও বয়লার কার্যক্রম একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় কোনো একটি ধাপে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে তার প্রভাব পড়ে।
উৎপাদন সচল রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল জেনারেটর, ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। এতে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সেই অতিরিক্ত ব্যয় ক্রেতার ওপর চাপানো কঠিন। ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মূল্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি ঘাটতিতে উৎপাদন বিলম্বিত হলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ক্রেতার মূল্যছাড় দাবি, ব্যয়বহুল আকাশপথে পণ্য পাঠানো এবং ভবিষ্যতে অন্য দেশে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমলে শ্রমিকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যার প্রভাব স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ও পড়ে।
মো. আশরাফ-উদ-দৌলা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা না গেলে সেই সুযোগ ধরে রাখা কঠিন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি জরুরি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা একসঙ্গে নিতে হবে।
তিনি রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকারভিত্তিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ বরাদ্দের পরামর্শ দেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের প্রয়োজন হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগাম সময়সূচি জানানোর ওপরও গুরুত্ব দেন, যাতে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা সমন্বয় করতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, পাইপলাইন ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সমন্বিত জরুরি পরিকল্পনার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারকারী রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানকে সীমিত সময়ের জন্য শুল্ক–কর সমন্বয় বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। তবে এ ধরনের সুবিধা উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করে স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা, জ্বালানি–সাশ্রয়ী বয়লার ও মোটর ব্যবহার এবং পুরোনো যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যকে জাতীয় জ্বালানি নীতিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় শিল্প জ্বালানি টাস্কফোর্স গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি। ওই টাস্কফোর্স নিয়মিত শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে সরকারকে সুপারিশ করতে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বিলম্বিত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর রপ্তানি পণ্য সময়মতো পাঠাতে চট্টগ্রাম বন্দর, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো, শুল্ক কর্তৃপক্ষ ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে বিশেষ সহায়তার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়, কারখানায় কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ থাকা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে শ্রমিকের আয়, উদ্যোক্তার আর্থিক দায়, ক্রেতার কাছে প্রতিশ্রুতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা জড়িত। তাই রপ্তানি সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান সুরক্ষায় দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।