লুঙ্গির কোচ থেকে ভাড়া দেওয়ার সময় ইসমাইল হোসেনের কাছে থাকা বিপুল টাকা নজরে পড়ে বাসের সুপারভাইজারের। এরপর সেই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার লোভে ভয়ংকর পরিকল্পনা করে বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপার। নির্ধারিত গন্তব্যে না নামিয়ে বাসের ভেতরেই হাত-মুখ বেঁধে হত্যা করা হয় তাকে। পরে রাজধানীর বনানী এলাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে রাখা হয় লাশ।
এ ঘটনায় ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন।
গ্রেপ্তার তিনজন হলেন—বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে বনানী থানার আওতাধীন এয়ারপোর্টমুখী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকার খবর আসে। ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।
মরদেহের মুখ ও দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বাঁধা ছিল। গলায়ও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পরে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হয়। নিহত ব্যক্তি ইসমাইল হোসেন। পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে মরদেহের ছবি দেখে তার পরিচয় শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় ইসমাইলের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের নিজ এলাকায় জমি বিক্রি করে পাওয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাচ্ছিলেন ইসমাইল। তার ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও ইসমাইল সেখানে না পৌঁছানোয় পরিবারের উদ্বেগ বাড়ে। একপর্যায়ে তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
হত্যার রহস্য উদঘাটনে তদন্তে নামে পুলিশ। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সন্দেহজনক একটি বাসের গতিবিধি শনাক্ত করা হয়। পরে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ বাসটি জব্দ করা হয়।
এরপর বাসের সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় বাসচালক সোহেল রানাকে।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার নেপথ্যের ঘটনাও সামনে আসে।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের দিকপাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইল ওই বাসে ওঠেন। কিছুক্ষণ পর সুপারভাইজার ভাড়া চাইলে ইসমাইল লুঙ্গির কোচ থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন। তখন তার কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকা দেখতে পান সুপারভাইজার সাজু।
সুপারভাইজার বিষয়টি বাসচালককে জানান। ইসমাইলের কাছে বড় অঙ্কের টাকা রয়েছে বুঝতে পেরে তিনজন মিলে সেই টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চান্দুরা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে নামানো হয়নি। বরং অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় নামিয়ে দিয়ে তাকে বলা হয়, নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে ডেকে দেওয়া হবে। একপর্যায়ে ইসমাইল ঘুমিয়ে পড়লে বাসটি গন্তব্যের পরিবর্তে ঢাকার দিকে নিয়ে আসা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, পরে বাসের ভেতরেই ইসমাইলের হাত ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেন সুপারভাইজার ও হেলপার। এরপর গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর বাসটি এয়ারপোর্ট এলাকা থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠে। বনানীর দিকে যাওয়ার পর ইউটার্ন নিয়ে আবার এয়ারপোর্টের দিকে ফেরার সময় এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ইসমাইলের মরদেহ ফেলে রেখে যায় অভিযুক্তরা।
নিহতের কাছে জমি বিক্রির প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুরো টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাকি টাকার কী হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
একজন যাত্রীর কাছে থাকা টাকা দেখে তাকে বাসের ভেতরেই হত্যার এই ঘটনায় গণপরিবহনে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে পুরো ঘটনার পেছনে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।