মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবার আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে সমুদ্রপথে। যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংসের পর পাল্টা জবাব হিসেবে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন সেনারা ব্যবহার করেন এমন একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা জানিয়েছে তেহরান।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে সর্বশেষ এই ঘটনাকে সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বুধবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে যে ১০টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে দুটি যুক্তরাষ্ট্রের এবং বাকি আটটি তেলবাহী জাহাজ।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার কথা জানায়। মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য, তাদের একটি যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর এর প্রতিক্রিয়ায় ওই অভিযান চালানো হয়। ওই ঘটনায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের পাল্টা হামলায় অন্তত একজন নাবিক নিহত এবং একজন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুবাই উপকূলে নোঙর করা তেলবাহী জাহাজ ‘হারকিউলিস স্টার’-এ হামলার পর এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া ইরাকের জলসীমায় প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী ‘নিউ অ্যান্ড্রোস’ নামের একটি জাহাজে ড্রোন হামলার পর আগুন ধরে যায়। ইরাকি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির ২২ জন নাবিকই নিরাপদে রয়েছেন।
হরমুজ প্রণালীর উভয় পাশে উত্তর উপসাগর ও ওমান উপসাগর এলাকায় আরও কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বহনকারী একটি জাহাজও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র
সমুদ্রপথের হামলার পাশাপাশি জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটিও ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। জর্ডানের দাবি, ওই ঘাঁটি লক্ষ্য করে ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রও জানিয়েছে, তাদের সব সেনা নিরাপদে আছেন।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী সতর্ক করে বলেছে, তাদের ওপর নতুন করে হামলা চালানো হলে আগের চেয়ে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রে নতুন ও বড় একটি নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বাহিনীটি। প্রস্তাবিত এলাকাটি পাকিস্তানের কাছাকাছি চাবাহার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে জানা গেছে।
হরমুজ ঘিরে তেলের বাজারে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। হামলার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। কিন্তু সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সেখানে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের হিসাবে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে। অথচ গত ৩০ আগস্ট যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ার আগে দৈনিক এই পথে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল।
এদিকে ইয়েমেনে ইরানসমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের কয়েকটি তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনায় আগুন লাগার পাশাপাশি বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই যুদ্ধের অবসান ঘটবে, কারণ ততদিনে ইরানের পক্ষে আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন উপদেষ্টা ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন যে চলমান যুদ্ধ তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্তও গড়াতে পারে।
তবে ওই প্রতিবেদনের এই দাবিটি রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।