বাইরে লক্কড়-ঝক্কড়, ভেতরে দমবন্ধ গাদাগাদি। ভাগ্য ভালো হলে একটি সিট জুটলেও জুটতে পারে। কিন্তু স্বস্তি কোথায়? মাথার ওপরের ফ্যানটি কখন খুলে পড়ে, কে জানে ! কোনটা চলছে, কোনটা শুধু ঘুরছে। কোনটা কবে খুলে পড়েছে বোঝার উপায় নেই। এটাই ঢাকা শহরের প্রধান গণ পরিবহণ লোকাল বাসের নিত্য দিনের চিত্র। অথচ কোথাও যেন কেউ নেই এই জন ভোগান্তি দেখার। সরকারের সংস্থাগুলি যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।
সিটে বসতেই গদির নিচের স্প্রিং শরীরকে খোঁচাতে থাকবে। সিটের কভার দেখে মনে হবে, ডাস্টবিন থেকে তুলে এনে লাগানো হয়েছে। সর্বশেষ কবে ধোয়া-মোছা হয়েছে, তা হয়তো বাসের মালিকও জানেন না। খালি চোখে জীবাণু দেখা না গেলেও অপরিষ্কার, বহু মানুষের ব্যবহৃত সিট ও হাতলে জীবাণুর সংস্পর্শের ঝুঁকি থাকেই। নিয়মিত এমন পরিবেশে চলাচলে ত্বকের অ্যালার্জি, চুলকানি, ফাঙ্গাল সংক্রমণ এবং ভিড়-বদ্ধ পরিবেশে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এর ওপর বাসের ভেতরে সাঁটানো নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপন। পরিবার নিয়ে উঠলে অস্বস্তি, সঙ্গে ছোট শিশু থাকলে তো কথাই নেই (!)তার সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অভিভাবকই বোকা বনে যান!
আছে পকেটমারের উৎপাত। একটু অসতর্ক হলেই মানিব্যাগ, মোবাইল কিংবা মূল্যবান জিনিস হাপিস। আর গন্তব্যে নামার সময়? আপনি যেখানে নামতে চান, বাস সেখানে থামবে। এমন নিশ্চয়তাও নেই। অনেক সময় গন্তব্য থেকে দূরে নামিয়ে দেওয়া হবে। অথচ ওঠার সময় রাস্তার প্রায় যেকোনো জায়গাই যেন বাসস্টপ!
তখন মনে পড়ে যায় সেই গান
‘বন্ধু তুই লোকাল বাস,
আদর কইরা ঘরে তুলিস,
ঘাড় ধইরা নামাস।’
সাধারণ যাত্রীর অবস্থা
বাসের সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করাও যেন অপরাধ। কনট্রাক্টর কিংবা চালক-হেলপারের ঝাড়ির ভয়ে চুপ থাকতে হয়। সহযাত্রীদের কাছ থেকেও অনেক সময় শুনতে হয়
‘এত আরাম দরকার হলে প্রাইভেট কার কিনে নিন।’
অথচ সাধারণ যাত্রী বিলাসিতা চান না। তিনি চান নিরাপদে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে এবং সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে। এটুকুই কি খুব বেশি চাওয়া?
ভাঙা সিট ও উচ্চ শব্দের স্বাস্থ্যঝুঁকি
ভাঙাচোরা সিটের বেরিয়ে থাকা স্প্রিং বা ধাতব অংশে আঘাত, আঁচড় বা কাটা লাগতে পারে। দীর্ঘক্ষণ শক্ত ও অসমান সিটে বসে থাকলে কোমর, পিঠ, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা, পেশিতে টান কিংবা অবশভাব হতে পারে।
অন্যদিকে প্রতিদিন উচ্চ শব্দের হর্নের মধ্যে চলাচলে কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ, কানে চাপ বা অস্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্রবণশক্তির ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত শব্দ মাথাব্যথা, বিরক্তি, মানসিক চাপ ও ক্লান্তি বাড়াতেও পারে। দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের কিছু ঝুঁকির সম্পর্কও গবেষণায় পাওয়া গেছে।
তাহলে প্রশ্নটা খুবই সরল—
গণপরিবহন কি শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার যান, নাকি যাত্রীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সম্মান নিশ্চিত করারও একটি ব্যবস্থা?
সাধারণ যাত্রী বিলাসবহুল বাস চান না। সরকারের এজেন্সীগুলির উপযুক্ত নজরদারী। চান শুধু পরিষ্কার সিট, নিরাপদ যান, সহনীয় শব্দ, শৃঙ্খলিত ওঠানামা, নির্ধারিত স্থানে নামার সুযোগ এবং ন্যূনতম ভদ্র আচরণ।
এই সামান্য চাওয়াগুলো পূরণ হলেই হয়তো গণপরিবহনের যাত্রা আর প্রতিদিনের ‘দোজখযাত্রা’ মনে হবে না।
লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, অরণ্য নিউজ