ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তিনটি প্রকল্পে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্তের পর সামনে এসেছে অর্থনৈতিক টেকসইতার প্রশ্ন। এত বড় বিনিয়োগের বিপরীতে মেট্রোরেলের আয় দিয়ে ঋণের কিস্তি ও পরিচালন ব্যয় কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বুধবার ঢাকার হেমায়েতপুর–ভাটারা, বিমানবন্দর–কমলাপুর এবং গাবতলী–দাসেরকান্দি রুটের তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন ও ব্যয় সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্প তিনটির আওতায় পাতাল ও উড়াল মিলিয়ে ৬৪ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে।
তিন প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়ছে প্রায় ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে কি?
মেট্রোরেল আইনে জনসাধারণকে স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত ও উন্নত গণপরিবহনসেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মেট্রোরেলের পরিচালন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে উত্তরা–মতিঝিল পথে মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। পুরো ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে লাগে ৯০ টাকা। একই দূরত্বে সরকার নির্ধারিত বাসভাড়া প্রায় ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা।
ফলে বিপুল বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে ভাড়া কতটা বাড়ানো যাবে—সেটিও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। আবার ভাড়া যাত্রীদের সামর্থ্যের বাইরে গেলে মেট্রোরেলের গণপরিবহন হিসেবে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও সামনে আসবে।
বর্তমান মেট্রোরেলের আয় কত?
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় মেট্রোরেলের বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হয়। ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উত্তরা–মতিঝিল পথে টিকিট বিক্রি থেকে অনিরীক্ষিত আয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে আয় ছিল প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা। ২০২২–২৩ অর্থবছরে আংশিক চলাচল থেকে আয় হয়েছিল ২২ কোটির বেশি।
সব মিলিয়ে সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত যাত্রীভাড়া থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা। এর বাইরে দোকানভাড়া, বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য খাত থেকে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় হয়।
অন্যদিকে শুধু বেতন, ভাতা, বিদ্যুৎসহ পরিচালন ব্যয়েই গত অর্থবছরে ১০০ কোটির বেশি টাকা খরচ হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতি কেনার দায়িত্বও এখন ডিএমটিসিএলের ওপর পড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে পরিচালন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
ঋণের কিস্তিই বড় চাপ
উত্তরা–কমলাপুর মেট্রোরেল নির্মাণে জাইকার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ। সুদসহ এই ঋণ ৩০ বছরে দুটি কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে।
২০২৩ সালের জুন থেকে সীমিত পরিসরে কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। চলতি বছর প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা কিস্তি দেওয়ার কথা। ২০৩০–৩১ সাল পর্যন্ত কিস্তি বাবদ ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হবে।
বর্তমান উত্তরা–মতিঝিল মেট্রোরেলের আয় দিয়ে এই কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না বলে ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নতুন দুটি জাইকা-অর্থায়িত প্রকল্পের জন্য প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে। এসব ঋণ পরবর্তী ৪০ বছরে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে নতুন আরেকটি মেট্রোরেল প্রকল্পে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা রয়েছে।
কিলোমিটারপ্রতি ব্যয়ে বড় পার্থক্য
তিন প্রকল্পের গড় ব্যয়ের সঙ্গে বিদ্যমান উত্তরা–মতিঝিল মেট্রোরেলের ব্যয়েরও বড় পার্থক্য রয়েছে। উত্তরা–মতিঝিল পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। নতুন প্রকল্পগুলোতে এই ব্যয় অনেক বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডিএমটিসিএল এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করেছিল। ওই বিশ্লেষণে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা।
ব্যয় বাড়ার কারণ নিয়েও প্রশ্ন
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাইকার ঋণের কিছু শর্ত এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের সম্পৃক্ততার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা, দরপত্র প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে জাপানি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। দরপত্রের কিছু কারিগরি শর্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে এমআরটি লাইন-১-এর পাতালপথে ‘ওয়ান-পাস জয়েন্ট’ পদ্ধতি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক এই বিপুল বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে আগে থেকেই ঋণের চাপ রয়েছে; নতুন প্রকল্পের ঋণ সেই চাপ আরও বাড়াবে।
তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে উত্তরা–কমলাপুর মেট্রোরেলকে সবচেয়ে লাভজনক পথ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সেই প্রকল্পের ব্যয়ই এখনো পুরোপুরি তোলা যাচ্ছে না।
তাঁর মতে, জাইকা সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রযুক্তি, ঠিকাদারি ও তদারকির বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থাকায় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ঋণ, প্রযুক্তি ও পণ্য কেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন।
সব মিলিয়ে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের চেয়ে এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে আয়, ঋণ পরিশোধ, ভাড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের ভার কীভাবে সামলানো হবে।
রূপক/ অরণ্য নিউজ- 17/09/26