সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মোট ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একইসঙ্গে ২৩টি ব্যাংক হিসাবে ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও পেয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার এসব অভিযোগে আনিসুল হকসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। সংস্থাটির সচিব মো. সাইদুর রহমান খান ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
মামলার অপর তিন আসামি হলেন—আনিসুল হকের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হক কলি, ভাগ্নে শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম এবং কাজিন হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইকবাল।
দুদকের ভাষ্য, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এই তিনজন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আনিসুল হককে সম্পদ অর্জনে সহযোগিতা করেছেন। এ কারণে তদন্ত শেষে তাদেরও আসামি করা হয়েছে।
বৈধ আয়ের তুলনায় সম্পদ কত বেশি
দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, আনিসুল হকের গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। পারিবারিক ব্যয় বাদ দেওয়ার পর তার নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৮ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৯৪০ টাকা।
অন্যদিকে আনিসুল হক ও সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তির নামে মোট ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। গ্রহণযোগ্য নিট আয় বাদ দেওয়ার পর ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের হিসাবে, ২০০০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত সময়ে এসব সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
আনিসুল হকের নিজের নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকার সম্পদ রয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ১ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে অপর তিন ব্যক্তির নামে।
তাদের মধ্যে জেবুন্নেসা বেগম হক কলির নামে ২৩ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ৩২১ টাকা, শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলামের নামে ২০ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার ৪৪৪ টাকা এবং মোহাম্মদ ইকবালের নামে ৪০ কোটি ১ লাখ ২৩ হাজার ২৩৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।
দুদকের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, এই তিন ব্যক্তির নামে সিটিজেনস ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার রয়েছে।
২৩ ব্যাংক হিসাবে ৭৩৭ কোটি টাকার লেনদেন
আনিসুল হক ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৩টি ব্যাংক হিসাবও তদন্তের আওতায় আনে দুদক।
তদন্তে এসব হিসাবে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা এবং ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকা।
দুদক এসব লেনদেনকে ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির অভিযোগ, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের উৎস গোপন, রূপান্তর ও স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে এসব লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।
এজাহারের তুলনায় বেড়েছে সম্পদের হিসাব
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলাটি করে দুদক। তখন এজাহারে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪৬ কোটি ১৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং ২৯টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
তদন্ত শেষে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকা এবং সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকা হয়েছে বলে দুদক জানিয়েছে।
অভিযোগপত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার পাশাপাশি অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনার অভিযোগে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
আনিসুল হক ২০১৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। পরবর্তী সময়ে টানা তিন মেয়াদে তিনি একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তাকে ঢাকার সদরঘাট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে থাকা সম্পদসংক্রান্ত মামলায় আদালতের নির্দেশে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশও দেওয়া হয়।
রূপক/অরণ্য নিউজ/16 সেপ্টেম্বর ২৬