পরপর দুই দিনের ব্যবধানে দুই শিল্পীর মৃত্যুতে শোকের আবহ নেমে এসেছে দেশের বিনোদন অঙ্গনে। একদিকে অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী মুকুল জামিল, অন্যদিকে তরুণ নাট্যকার ও নির্মাতা মারুফ হোসেন সজীব। একজন গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতার কাছে পরিচিত ছিলেন, অন্যজন গল্প ও নির্মাণশৈলীতে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব পরিচয়। তাদের আকস্মিক চলে যাওয়া সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মনে তৈরি করেছে গভীর শূন্যতা।
হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলেন মুকুল জামিল
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান মুকুল জামিল। তার মৃত্যুতে সংগীত ও অভিনয় অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সহকর্মী তাকে স্মরণ করে শোক প্রকাশ করেন। অভিনয়শিল্পী সংঘও তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে।
সংগীতশিল্পী মিলনের কাছে মুকুল জামিলের মৃত্যু ছিল বিশেষভাবে বেদনাদায়ক। প্রিয় সহকর্মীকে স্মরণ করে তিনি লেখেন, ‘মুকুল জামিল ভাই এভাবে হঠাৎ চলে যাবেন, এটা আমার জন্য প্রচণ্ড কষ্টের।’ দেখা হলেই বুকে জড়িয়ে ধরা ও কপালে চুমু দেওয়ার সেই মানুষটির সঙ্গে আর দেখা হবে না—এই বাস্তবতাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
গানে দীর্ঘ পথচলা
শৈশব থেকেই রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি মুকুল জামিলের গভীর আগ্রহ ছিল। বোনের হাত ধরে তার সংগীতজগতে প্রবেশ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৩০টির বেশি মিক্স অ্যালবামে কাজ করেছেন তিনি। প্রকাশিত হয় তার একক অ্যালবাম ‘আমি তো এমনই’।
‘মন’, ‘আচ্ছা’, ‘বিলবোর্ড’, ‘ভালবাসার মানে’ ও ‘ফাগুনের হাওয়া’সহ তার বেশ কয়েকটি গান শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পায়। ‘চায়ের চুমুকে’ গানটিও প্রচারিত হয় এটিএন বাংলায়।
গানের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন মুকুল জামিল। ‘ওয়েডিং বেলস’ (২০১৯), ‘আমানুষ’ (২০২২) ও ‘ছাত্রী বউ’ (২০২৪) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সংগীতশিল্পী মিলনের গানের ভিডিওতেও দেখা গেছে তাকে।
পরদিনই সজীবের আকস্মিক মৃত্যু
মুকুল জামিলের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই আসে আরেকটি দুঃসংবাদ। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৫টার দিকে ঘুমের মধ্যেই মারা যান তরুণ নাট্যকার ও নির্মাতা মারুফ হোসেন সজীব।
বছরের শুরু থেকেই হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তবে মৃত্যুর আগের রাতেও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, আড্ডা দিয়েছেন। সেই আড্ডাই যে তার জীবনের শেষ সময় হয়ে উঠবে, তা কেউ ভাবতে পারেননি।
সজীবের মৃত্যুতে ছোটপর্দায়ও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সজীবের ছবি প্রকাশ করে লেখেন, ‘আমাদের সকলের প্রিয় নির্মাতা মারুফ হোসেন সজীব আর নেই।’
গল্প বলার নিজস্ব ভঙ্গি ছিল সজীবের
নাট্যকার হিসেবে নিজের গল্প নিজেই লিখতেন মারুফ হোসেন সজীব। পরে সেই গল্প ক্যামেরায় তুলে ধরতেন নিজস্ব নির্মাণশৈলীতে। গল্প বলার ভিন্ন ধরন ও নির্মাণের প্রতি যত্ন তাকে সমসাময়িক নির্মাতাদের মধ্যে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একাধিক সম্মাননাও।
মুকুল জামিল ও মারুফ হোসেন সজীবের কাজের ক্ষেত্র ছিল ভিন্ন। একজন সুর ও অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছেছেন, অন্যজন গল্প ও দৃশ্যের মাধ্যমে। কিন্তু আকস্মিক মৃত্যু তাদের দুজনের বিদায়কে মিলিয়ে দিয়েছে একই বিষাদের সুরে।
তাদের নতুন গান শোনা যাবে না, নতুন গল্পও হয়তো আর দেখা যাবে না। তবে শিল্পীর জীবন থেমে গেলেও তার সৃষ্টি থেমে থাকে না। গান, অভিনয়, গল্প ও নির্মাণের মধ্য দিয়েই তারা বেঁচে থাকবেন দর্শক-শ্রোতার স্মৃতিতে।
দুই দিনে দুই বিদায়—কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সৃষ্টিগুলোই হয়ে থাকবে তাদের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।