এমন প্রশ্নও ঘুরে ফিরেই উঠেছে। সরকার গঠনের মাত্র সাত মাসের মাথায় এ নিয়ে বিএনপি সরকার তিন দফায় তেলের দাম বাড়ালেও শুল্ক কমানোর পথে হাঁটল না কেন?
নানামুখী চাপে থাকা অর্থনীতি আর সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমে সংকুচিত হয়ে যাওয়ার মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ২০ টাকা করে বাড়াল সরকার; এখন প্রশ্ন আসছে এ মূল্যবৃদ্ধির মূলে কী?
সাধারণের ওপর বাড়তি চাপের বোঝা হয়ে দেখা দিতে যাওয়া এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আগের রাত থেকেই শুরু হয়েছে আলোচনা। সীমিত আয়ের মানুষ নতুন করে দাম বাড়ার শঙ্কা নিয়ে দিন শুরু করেছেন।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা ভাবছেন মূল্যস্ফীতির পারদ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে। এরমধ্যেই ঘুরে ফিরে আলোচনায় কথা উঠছে, নতুন সরকার একবারে এতটা দর না বাড়িয়ে আর কিছু কী করতে পারত?
চলতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের কারণে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হতে থাকলে সব ধরনের জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকে। এতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের চাপ ছিল। তবে এবার একবারে এতটা দর বাড়ানোর কারণ এটিই নাকি অন্যকিছু- সেই প্রশ্নও এসেছে আলোচনায়।
একই সঙ্গে ভর্তুকি কমাতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের চাপ ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তরফেও। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা এ সংস্থা আওয়ামী লীগ আমলের সময় করা আগের ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। নতুন করে সংস্থাটি থেকে ঋণ পেতে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি সরকার। নতুন চুক্তির আলোচনায় আবার জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি এসেছে কিনা- সেই প্রশ্নও আছে।
রোববার রাতে দেশে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোল—চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দর অনুযায়ী খুচরায় প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ ও অকটেনের দর ধরা হয়েছে ১৬৫ টাকা।
এর আগে গত জুনে আরেক দফা বাড়ানো হয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম। তখন ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়। পরের তিন মাস সেই দাম বহাল রাখার পর এবার একবারে বাড়ানো হয় ২০ টাকা। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের দামও বাড়ানো হয়।
দেশের সীমিত মানুষের আয়ের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে কৃষি ও পরিবহনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলে ভর্তুকি দিয়ে আসছে সব সরকারই। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতে থাকলেও দাম সমন্বয় না করে বাড়তি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফা করার নজিরও আছে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, সরকারি চাকুরেদের দ্বিগুণ বা এরও বেশি বেতন বাড়ানোর কারণে মূল্যস্ফীতি উসকে ওঠার শঙ্কার মধ্যে এখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিকে কারণ দেখিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক হল।
এমন প্রেক্ষাপটে দাম বাড়ানোর বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিপিসির অতীতের মুনাফার দিকটি তুলে ধরে বলেন, “আপনার অবগতির জন্য বলছি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটতো শুরু হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে। বিপিসির কোষাগারে অর্থ ছিল বলেই এতদিন পর্যন্ত বিপিসি মূল্য সমন্বয় (দাম না বাড়িয়ে) না করে থাকতে পেরেছিল।
“২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা যে সে (বিপিসি) লোকসান দিতে পারল, এটা যে সে এফোর্ড করতে পারল, কোথা থেকে পারল? একটি সময়ে সে এটা লাভ করেছে কিংবা তার কোষাগারে অতিরিক্ত অর্থ ছিল বলেই এটা করতে পেরেছে।”
সরকারের দাবি, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য ও জাহাজ ভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে।
সরকারের তরফে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার জনস্বার্থে দেশে দাম বাড়ায়নি। ফলে মার্চ থেকে অগাস্ট সময়ে বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে, দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে লোকসান কমানোর বিষয়টি উল্লেখযোগ্য হলেও অন্য কিছু বিষয়ও সামনে এসেছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপে ছিল সরকার। এরইমধ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয় ভর্তুকির জন্য টাকা চাইলে তাতে সায় মেলেনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের।
অপরদিকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, অর্থছাড় বাড়িয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ডসহ নানাবিধ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অর্থ সংকুলানের চাপে রয়েছে সরকার। এরমধ্যে রাজস্ব আদায়েও নেই গতি। বরং নতুন অর্থবছরের আড়াই মাস পার হলেও প্রথম মাসের রাজস্ব আদায়ের তথ্য প্রকাশ করছে না এনবিআর।
প্রথম দুই মাসের রাজস্ব আহরণের অপ্রকাশিত তথ্য বলছে, কেবল মূল্য সংযোজন কর-মূসক বা ভ্যাট আদায় কমেছে ২২ শতাংশের মত। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের বিনিয়োগ ভাটা পরিস্থিতির মধ্যেও গত অর্থবছরের জুলাই-অগাস্টে যে ভ্যাট আদায় হয়েছিল, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তার চেয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে।
এমন বাস্তবতায় রাজস্ব আদায় বাড়াতেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোকে যুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সরকারের ভর্তুকি কমার পাশাপাশি প্রতি লিটার তেল বিক্রিতে বাড়তি রাজস্ব আদায়ও হবে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরাও এমনটা বলছেন। তাদের মতে, এর ফলে রাজস্ব আদায় বাড়বে।
তবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পথে না হেঁটে জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে তারা ‘ভ্যাট-ট্যাক্স’ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানি করা থেকে খুচরায় বিক্রি পর্যন্ত সব মিলিয়ে শুল্ক-কর ৩০ শতাংশের মত। অর্থাৎ এ পদ্ধতিতে দাম বাড়লে শুল্ক-কর আদায়ও বেড়ে যায়।
জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়াম পিএলসির চেয়ারম্যান ম. তামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই জিনিসটা আগেও বলেছিলাম, সরকারকে বলেছিলাম যে এটা ফিক্সড করে দিলে ভালো হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স মূল্যের সাথে না বাড়াইলে মানুষ একটু স্বস্তি পাবে।
“এখন প্রাইসের সাথে যদি ট্যাক্স-ভ্যাটও বাড়ে তাহলে নিশ্চিতভাবেই সরকারের রাজস্বতো বাড়বেই। সেটার একটা সুযোগ পাবে তারা।”
সরকার ‘ব্যবসায়ী’ ও ‘মুনাফাভোগীর’ মত আচরণ করছে অভিযোগ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকার এ খাত থেকে প্রচুর মুনাফা করে। সরকার করপোরেট কর পায়, সরকার লভ্যাংশ খায়। আবার ওদিকে ভ্যাট নেয়, ট্যাক্স নেয়, শুল্ক নেয়। তো সরকারের একই অঙ্গে এত রূপ!
“এই রূপই হচ্ছে আমাদের মূল্যবৃদ্ধি বা তেল খাতের শোষণের বা লুণ্ঠনের অন্যতম একটি কারণ, বড় কারণ—আরও কারণ আছে।”
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা মুনাফামুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, “জ্বালানি সেবা দিতে যেটুকু টাকা খরচ হবে, সে শুধু সেইটুকু টাকা জনগণের কাছ থেকে নেবে।
“এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সহনীয় পর্যায়ের পর্যায়ের সে কিছু রাজস্ব আহরণ করবে। কিন্তু সে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত বেপরোয়া।”