বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানিতে শুল্ক-কর বাবদ প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সংস্থাটি।
এর মধ্যে একক পণ্য হিসেবে ডিজেল থেকেই সরকারের রাজস্ব আয় সবচেয়ে বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ডিজেল আমদানিতে বিপিসি ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর দিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রকাশিত ২০২৫-২৬ সালের শুল্ক কাঠামোতেও ডিজেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও করের হার নির্ধারিত রয়েছে।
মুনাফার অঙ্ক ৫৩ হাজার কোটি টাকা
বিপিসির নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরেই ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছিল। বাকি বছরগুলোতে সংস্থাটি মুনাফা করেছে।
সব মিলিয়ে ওই ১১ অর্থবছরে বিপিসির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।
তবে সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। বিপিসির প্রাথমিক হিসাবে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনে দেশে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয়ের সময়ও বিপিসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিতে সংস্থাটির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
মুনাফার পুরো অর্থ বিপিসির হাতে নেই
বিপিসি জানিয়েছে, অতীতে অর্জিত মুনাফার পুরো অর্থ বর্তমানে সংস্থাটির হাতে নেই। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত অর্জিত মুনাফা থেকে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয়েও অর্থ ব্যয় হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত ১ মার্চ সংস্থাটির হাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা ছিল। এরপর জ্বালানি আমদানির বিলসহ বিভিন্ন দায় পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য অর্থ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। ৪০টি ঋণপত্রের অর্থের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে।
প্রতি লিটার ডিজেলে ব্যয়ের বড় অংশ শুল্ক-কর
চলতি মাসে বিপিসি প্রায় ১৩ কোটি ১৩ লাখ লিটার ডিজেল খালাস করেছে। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর পর্যন্ত প্রতি লিটার ডিজেলের গড় আমদানি ব্যয় ছিল ১২৬ টাকা ৪১ পয়সা।
এর সঙ্গে প্রায় ৩৩ টাকা শুল্ক-কর যুক্ত হলে ব্যয় দাঁড়ায় ১৫৯ টাকা ৪১ পয়সা। এরপর বন্দর থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পরিবহন, পরিচালন ব্যয়, ডিলার কমিশন ও উন্নয়ন তহবিলসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭৬ টাকা ৬৮ পয়সা।
বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হওয়ায় এই হিসাব অনুযায়ী ঘাটতি রয়েছে। তবে বিপিসির চেয়ারম্যানের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারদর, শুল্ক-কর, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের প্রকৃত ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা। সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের আগে ১১৫ টাকায় বিক্রি করায় প্রতি লিটারে ঘাটতি ছিল প্রায় ৯০ টাকা। মূল্য বাড়ানোর পরও সেই ব্যবধান পুরোপুরি দূর হয়নি।
কেন বাড়ানো হলো জ্বালানির দাম
সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বিপিসির লোকসান এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
জ্বালানি বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা পুরোপুরি অনুসরণ করলে ডিজেলের দাম আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। তবে ভোক্তা, কৃষি ও গণপরিবহন খাতের ওপর চাপ বিবেচনায় নিয়ে সরকার তার চেয়ে কম দামে ডিজেল বিক্রি করছে।
এবার ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে
অতীতে বিপিসির মুনাফা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়লেও বর্তমানে সংস্থাটি আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে। বিপিসির পক্ষ থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক মূল্য বৃদ্ধির ফলে বিপিসির লোকসানের চাপ কিছুটা কমবে বলে সংস্থাটি আশা করছে। একই সঙ্গে জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ নতুন আমদানির অর্থায়নে ব্যবহার করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শুল্ক-কর কমানোর সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন
জ্বালানির দাম বাড়ানোর পরিবর্তে আমদানি পর্যায়ের শুল্ক-কর কমিয়ে ভোক্তার ওপর চাপ কমানো যেত কি না—এ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, বিপিসির মুনাফার একটি অংশ সংকটের সময়ে পুনরায় সংস্থাটিকে দিলে বাজারদর সমন্বয়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারত।
অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিপিসিকে দীর্ঘমেয়াদে ‘না লাভ, না ক্ষতি’ কাঠামোয় পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সংস্থাটির পরিচালন ব্যয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন নিরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, কৃষি, শিল্প, উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ে। ফলে জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা এবং ভোক্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো