আজ বিশ্ব বসতি দিবস। প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয় নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই আবাসনের অধিকার এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের গুরুত্ব তুলে ধরতে। জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত এ দিবস নগর উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে সেই বার্তাই সামনে আনে। কিন্তু বিশ্ব বসতি দিবসের এই আহ্বানের বিপরীতে ঢাকার বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। রাজধানীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ আসছেন। অথচ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই আবাসনের ব্যবস্থা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে লাখো মানুষকে বস্তি, অস্বাস্থ্যকর ঘনবসতি, মেস, সাবলেট কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ও অননুমোদিত স্থাপনায় বসবাস করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ঢাকা জেলায় ২ লাখ ৮ হাজার ২৬৮টি বস্তি-পরিবারে প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার ৬২৮ জন মানুষ বসবাস করতেন। একই জনশুমারিতে প্রায় ৫ হাজার ৯৬৯ জন ভাসমান মানুষের তথ্যও পাওয়া যায়। বাস্তবে যা কয়েকগুন বেশী বলে অনেকেই মনে করেন।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার আবাসন বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দুই সিটি এলাকায় মাত্র ১৮ দশমিক ৮২ শতাংশ সাধারণ পরিবারের নিজস্ব বাসস্থান ছিল। বিপরীতে ৬৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ পরিবার ভাড়া বাসায় থাকত, যাদের অন্যত্র নিজস্ব dwelling unit রয়েছে। আরও ১২ দশমিক ১২ শতাংশ পরিবার ভাড়া বাসায় থাকলেও অন্য কোথাও তাদের নিজস্ব বাসস্থান নেই।
অর্থাৎ রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ আবাসনের জন্য ভাড়াবাজারের ওপর নির্ভরশীল। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও কঠিন। সীমিত আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় বাড়িভাড়া, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যাতায়াত খরচে। এরপর খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সঞ্চয়ের সুযোগ প্রায় থাকে না।
ঢাকার বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারীদের সমস্যা শুধু একটি ঘরের অভাব নয়। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা, ড্রেনেজ ও ভূমির নিশ্চয়তার ঘাটতিও তাদের জীবনকে অনিরাপদ করে তুলেছে।
ব্র্যাকের গবেষণায় ঢাকার অনানুষ্ঠানিক বসতিতে নিরাপদ পানির সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। এসব এলাকার অনেক পরিবারকে সরাসরি পানির সংযোগ না থাকায় তুলনামূলক বেশি দামে পানি সংগ্রহ করতে হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বেশি।
ভূমির মালিকানা বা দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক নিম্নআয়ের পরিবার সবসময় উচ্ছেদের আশঙ্কায় থাকে। একটি অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, জলাবদ্ধতা কিংবা উচ্ছেদ অভিযান তাদের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সামান্য সম্পদও মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারে।
বিশ্ব বসতি দিবসের মূল দর্শন হলো মানুষের জন্য শুধু একটি ছাদ নয়, প্রয়োজন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন। ঢাকার নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তবতা তাই এ দিবসের বার্তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নতুন বাসস্থানের প্রয়োজন হচ্ছে। ঢাকার মতো শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘমেয়াদে ভাড়া বাসার ওপর নির্ভরশীল থাকবে। অথচ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন ও সহজ শর্তের গৃহঋণের সুযোগ সীমিত।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্যেও দেশে আবাসন ঘাটতির বড় চিত্র উঠে এসেছে। বিদ্যমান ঘাটতি প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই চাহিদার বড় অংশই সাশ্রয়ী আবাসনের।
এ অবস্থায় শুধু বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে নিম্নআয়ের মানুষের আবাসন সংকট সমাধান করা কঠিন। কারণ বাজারমূল্যের আবাসন তাদের আয়সীমার বাইরে।
ঢাকার আবাসন সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলক কম আলোচিত দিক হলো ব্যাচেলর চাকরিজীবীদের সংকট।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চাকরির জন্য রাজধানীতে আসা তরুণ-তরুণীদের বড় একটি অংশ একা অথবা কয়েকজন মিলে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। কিন্তু ‘ব্যাচেলর’ পরিচয়ের কারণে অনেক বাড়িওয়ালার কাছ থেকে তারা বাসা ভাড়া পেতে সমস্যায় পড়েন।
কোথাও ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেওয়া হয় না, কোথাও আবার পরিবারকে দেওয়া ভাড়ার তুলনায় বেশি ভাড়া দাবি করা হয়। ফলে স্বল্পবেতনের চাকরিজীবীদের মেস, সাবলেট বা অতিরিক্ত ছোট কক্ষে থাকতে হয়।
একজন তরুণ চাকরিজীবীর আয় সীমিত হলেও তাকে নিরাপদ বাসস্থানের জন্য তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ, বিদ্যুৎ-পানি ও অন্যান্য ব্যয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগও থাকে না।
বিশ্ব বসতি দিবসের ‘সবার জন্য আবাসন’ ধারণার আলোকে এই শ্রেণির মানুষের সমস্যাকেও নগর আবাসন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ‘সামাজিক ও সাশ্রয়ী ভাড়া’ আবাসন তৈরি করা।
সরকারি জমিতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করে শ্রমিক, নিম্নআয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্বল্পবেতনের চাকরিজীবীদের জন্য নিয়ন্ত্রিত ভাড়ায় আবাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে চালু করা যেতে পারে ‘Social Rental Housing’ বা সামাজিক ভাড়া আবাসন ব্যবস্থা। এতে মানুষকে বাড়ি কিনতে না হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও নির্দিষ্ট ভাড়ায় বসবাসের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব।
বস্তি উচ্ছেদের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ‘স্লাম আপগ্রেডেশন’ বা বস্তির জীবনমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা ও চলাচলের রাস্তা নিশ্চিত করে এসব এলাকাকে ধীরে ধীরে নিরাপদ বসতিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ঋণ, নির্মাণ ও ঘর সংস্কারের জন্য স্বল্পসুদের ঋণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে আবাসন প্রকল্পও প্রয়োজন।
আর ব্যাচেলর চাকরিজীবীদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ‘নিরাপদ ডরমিটরি, মেস ও ছোট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’ তৈরি করা যেতে পারে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা রাজধানীর আবাসন সংকট অনেকটাই কমাতে পারে।
বিশ্ব বসতি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় আবাসন শুধু চার দেয়াল ও একটি ছাদের নাম নয়। একটি মানুষের নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, যাতায়াত, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে আবাসন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ঢাকার নিম্নআয়ের মানুষের জন্য একটি ঘর পাওয়া যেমন জরুরি, তেমনি সেই ঘরটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদে বসবাসযোগ্য হওয়াও জরুরি। একইভাবে একজন ব্যাচেলর চাকরিজীবীও এই শহরের অর্থনীতির অংশ; শুধু বৈবাহিক পরিচয়ের কারণে তার নিরাপদ আবাসনের অধিকার সীমিত হওয়া উচিত নয়।
আজ বিশ্ব বসতি দিবসে তাই প্রশ্ন শুধু ঢাকায় কতগুলো নতুন ভবন তৈরি হলো? প্রশ্ন হওয়া উচিত এই শহরে যারা কাজ করেন, তাদের কতজন নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারছেন?
বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে হলে নগর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে মানুষকে। নিম্নআয়ের পরিবার, শ্রমজীবী মানুষ এবং একা থাকা চাকরিজীবীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে না পারলে একটি শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ নগর উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক- ০৫/১০/২৬