দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই। চলতি বছর এডিস মশাবাহিত রোগটিতে মৃতের সংখ্যা ৩০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৬৩১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদিকে ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষায় ব্যবহৃত কিটের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের অভিযোগ, জ্বরের প্রাথমিক পর্যায়ে এনএস-১ পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল এলেও পিসিআর পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। এতে রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তি ও চিকিৎসা শুরুতে বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শনিবার প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক হালনাগাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৯ জনে।
## হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ব্যক্তিরা বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে দুজন, ফেব্রুয়ারিতে দুজন, মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়। অক্টোবরের প্রথম ১১ দিনে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪ জন।
বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৭ হাজার ৮২ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯১ হাজার সাতজন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫ হাজার ৭৭৪ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৯২ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৪০৬ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ভর্তি হয়েছেন ২০৫ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৩৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া বরিশালে ২১৯, খুলনায় ১৮৪, রাজশাহীতে ১৪১, রংপুরে ৭৫, ময়মনসিংহে ৬১ এবং সিলেটে ১৪ জন ভর্তি হয়েছেন।
ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষায় ব্যবহৃত কিটের মান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জামাল উদ্দিন সাইফ।
তাঁর দাবি, ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের জ্বরের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে এনএস-১ পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল পাওয়া গেলেও পিসিআর পরীক্ষায় পজিটিভ ফল আসছে। এর পেছনে নিম্নমানের অ্যান্টিজেন কিটের ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ডা. জামাল উদ্দিন সাইফের অভিযোগ, বাজারে ‘অ্যাকুরেট’ নামের একটি কিট কম দামে ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মানসম্পন্ন অ্যান্টিজেন কিটের দাম প্রায় ১০০ টাকা হলেও ওই কিটের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। কম দামের এই কিট ডেঙ্গু শনাক্তে কতটা নির্ভরযোগ্য, তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষায় ভুল নেগেটিভ ফল এলে রোগী ও চিকিৎসক বিভ্রান্ত হতে পারেন। এতে রোগ শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব হতে পারে। রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে নির্দিষ্ট কোনো কিটের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরীক্ষার ফল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার কিটের মান, অনুমোদন ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন অভিযান কিংবা শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ এবং বছরজুড়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, কর্মস্থল ও আশপাশে পড়ে থাকা বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে পানি জমতে পারে এমন পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং বাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে নজর রাখা জরুরি। একই সঙ্গে মশার লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি পূর্ণবয়স্ক মশা দমনের ব্যবস্থাও নিতে হবে।
তাঁর মতে, শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের ওপর জোর দিতে হবে। কোন এলাকায় কী ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে পরিস্থিতি ও কার্যকারিতা বিবেচনায় নিয়ে।
ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য মশারি ব্যবহার, শরীরের অধিকাংশ অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এডিস মশা দিনের বেলাতেও কামড়াতে পারে। তাই শুধু রাতে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিলসমন্বিত উদ্যোগই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রধান চ্যালেঞ্জ
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, নিয়মিত প্রচার, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ধারাবাহিক অভিযান এবং কার্যকর নজরদারি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন।
একই সঙ্গে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের মান নিশ্চিত করা, রোগ শনাক্তের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা জোরদার এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০-এর কাছাকাছি পৌঁছানোর এই পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিরোধ ও চিকিৎসা—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সূত্র: কালবেলা
অরণ্য: ১১.১০.২৬