দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার রূপপুরে প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক চেইন বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম করল বাংলাদেশ। তবে চুল্লিতে বিক্রিয়া শুরু হলেও এখনই বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হচ্ছে না। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ বিক্রিয়া শুরু হয়। প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ অবস্থায় চুল্লির ভেতরে পারমাণবিক চেইন বিক্রিয়া স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে চলতে থাকে। এটি চুল্লি চালুর প্রক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
তবে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পরপরই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় না। পরবর্তী ধাপে চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং পর্যায়ক্রমে চুল্লির শক্তি বাড়ানোর কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুরের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এর আগে ইউনিটটির স্বয়ংক্রিয় চাপ নিয়ন্ত্রণকারী নিরাপত্তা ভালভে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সমস্যাটির সমাধান করা হয়। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও দুটি নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রয়োজন। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির পর চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পাশাপাশি ধাপে ধাপে এর উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে।
সব পরীক্ষা পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হলে প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ নাগাদ রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আশা প্রকাশ করেছে।
এর আগে গত ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে চুল্লির রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হয়। জ্বালানি স্থাপন থেকে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই নির্ধারিত কারিগরি ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটি থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরুর বিষয়টি নির্ভর করবে পরবর্তী পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার ওপর।
অরণ্য/ ১১/১০/২৬