জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সেপ্টেম্বরে দেশে খাদ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। এর প্রভাবে কয়েক মাস ধরে কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
৭ অক্টোবর বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ এ তথ্য প্রকাশ করে।
এর আগে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, মাসের শেষ দিকে এই দাম বাড়ানোর প্রভাব পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামে পড়তে শুরু করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে নিম্নমুখী মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পণ্যের দামে পড়েছে। এর প্রভাব আগামী দিনগুলোতেও থাকবে। ফলে আগামী দু-এক মাস মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা কম।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। আগস্টে এ হার ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমেছে। আগস্টে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরের ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির অর্থ হলো, গত বছরের একই সময়ে ১০০ টাকায় যে পণ্য বা সেবা পাওয়া যেত, এবার তা কিনতে গড়ে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা খরচ হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
গ্রাম-শহর দুই এলাকাতেই বেড়েছে
সেপ্টেম্বরে গ্রাম ও শহর দুই এলাকাতেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
গ্রামীণ এলাকায় সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আগস্টে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ।
শহরাঞ্চলে সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আগস্টে শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
লক্ষ্যের চেয়ে এখনও বেশি
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে সেপ্টেম্বর শেষে গত এক বছরের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ওই অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জিত হয়নি। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ।
চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। মার্চে কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ হলেও এপ্রিল, মে ও জুনে তা আবার ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৩২ এবং আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসে।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে মজুরি
দাম বাড়লেও মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার সে তুলনায় বাড়েনি। সেপ্টেম্বরে জাতীয় গড় মজুরি সূচক দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম ছিল। এর ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে এবং সংসার চালাতে চাপ বেড়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে কোনো মাসেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর.কম
অরণ্য- ০৭/১০/২৬