জাল ফেললে মাছের সঙ্গে উঠে আসছে প্লাস্টিক বর্জ্য। ধরা পড়া মাছের পেটেও মিলছে পলিথিনের টুকরা। শুধু জেলেদের অভিজ্ঞতাই নয়, গবেষণাতেও উঠে এসেছে বঙ্গোপসাগরের প্লাস্টিক দূষণের উদ্বেগজনক চিত্র। বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার উপকূলের প্রায় ৭৭ থেকে ৮২ শতাংশ সামুদ্রিক মাছের ফুলকা ও পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, একটি বেসলাইন জরিপে বলা হয়েছে, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিদিন গড়ে ৩৪.৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য কক্সবাজারের সমুদ্র ও সৈকতে গিয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাছের শরীরে জমা হওয়া প্লাস্টিক ও এর সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
গত ৫ অক্টোবর সাগরে মাছ ধরার সময় নৌকায় রান্নার জন্য একটি সামুদ্রিক পাঙাশ মাছ কাটেন জেলেরা। মাছটির পেটে পাওয়া যায় পলিথিনের টুকরা। কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এ অভিজ্ঞতার কথা জানান জেলে আবু জাফর।
তিনি বলেন, সাগরে জাল ফেললেই এখন প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। মাছের মুখ ও পেটেও মিলছে প্লাস্টিকের টুকরা। মাছ কাটতে গিয়ে অনেক সময় পলিথিন বের হচ্ছে।
জেলেদের এমন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামুদ্রিক মাছ নিয়ে পরিচালিত গবেষণার তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বোরির পরিবেশ, ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া জানান, বঙ্গোপসাগর ও কক্সবাজার উপকূলের বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রায় ৭৭ থেকে ৮২ শতাংশ মাছের ফুলকা ও পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যিক মাছগুলোর প্রতিটিতে গড়ে সাতটি বা তার বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম উৎস হিসেবে সিন্থেটিক ফাইবার, পুরোনো জাল ও কাপড় থেকে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র কণা, পলিথিন এবং পলিপ্রোপিলিনের কথা উঠে এসেছে। এসব বর্জ্য ভেঙে অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে পানি ও সামুদ্রিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করলে তার স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক ও পরিবেশ থেকে শোষিত ক্ষতিকর পদার্থ মাছের শরীরে জমার আশঙ্কা রয়েছে।
বোরির বিজ্ঞানী মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, মাছের পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিক জমলে পুষ্টি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এতে অপুষ্টি দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাছের মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তাঁর মতে, প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা সমুদ্রের পানি থেকে ক্যাডমিয়াম, সিসা ও নিকেলের মতো ভারী ধাতু এবং বিভিন্ন রাসায়নিক শোষণ করতে পারে। ফলে মাছের শরীরে এসব ক্ষতিকর উপাদান জমার আশঙ্কা থাকে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে দূষিত পদার্থ মানুষের শরীরেও পৌঁছাতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্ত, পরিপাকতন্ত্র ও টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং নির্দিষ্ট রোগের মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কক্সবাজারের নদী, খাল ও উপকূলীয় এলাকায় ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে মিশছে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সাগরে ফেলে দেওয়া পুরোনো ও ছেঁড়া মাছ ধরার জাল এবং প্লাস্টিকের দড়ি।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সংগঠনের কক্সবাজার শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, বাকখালী, মাতামুহুরী ও নাফ নদের তীরে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকতে দেখা যায়। এসব বর্জ্য নদী ও খালের মাধ্যমে সমুদ্রে গিয়ে মিশছে।
বোরির বিজ্ঞানী মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল নিরাপদে অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় শহরগুলোতে বর্জ্য সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্র্যাকের একটি বেসলাইন জরিপ অনুযায়ী, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিদিন গড়ে ৩৪.৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য কক্সবাজারের সমুদ্র ও সৈকতে গিয়ে পড়ছে। বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, অধিদপ্তরের বিভিন্ন গবেষণায় কক্সবাজারকে প্লাস্টিক দূষণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
তবে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে দূষণ কমানো কঠিন। পর্যটন এলাকা, বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বসতবাড়ির বর্জ্য যাতে সরাসরি নদী, খাল কিংবা সমুদ্রে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্লাস্টিক দূষণ শুধু সমুদ্রের পানিতে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন শহরের বাতাস ও ধুলাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর ধুলায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশিত হয়। গবেষণার ফল অনুযায়ী, বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রতি গ্রাম ধুলায় গড়ে ৫২টি এবং ঢাকায় প্রতি গ্রাম ধুলায় ১০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বাতাসে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেশের বাজারে পাওয়া ১৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। ওই গবেষণায় দেশের ৭৩ শতাংশ মাছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
গবেষণার এসব তথ্য ইঙ্গিত দেয়, প্লাস্টিক দূষণ এখন কেবল উপকূলীয় পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি স্থলভাগ, বায়ু, পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (ডব্লিউডব্লিউএফ) তথ্য অনুযায়ী, প্লাস্টিক দূষণের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক সামুদ্রিক প্রাণী মারা যায়। কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে সমুদ্রে প্লাস্টিকের পরিমাণ আরও বেড়ে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নদী ও খাল দিয়ে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এতে একদিকে সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক দূষণ কমাতে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল নিরাপদে অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দূষণের উৎস শনাক্ত, সামুদ্রিক মাছের ওপর নিয়মিত গবেষণা এবং খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব মূল্যায়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সাগরের মাছ ও সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
অরণ্য: ১১.১০.২৬