ইলিশ রক্ষায় প্রতিবছরই আসে নিষেধাজ্ঞা। নদী ও সাগরে নামে নীরবতা, ঘাটে সারি সারি নৌকা পড়ে থাকে, জেলের জাল শুকাতে থাকে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য একটাই প্রজননক্ষম মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া। এ বছরও ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার সাফল্য কি শুধু নদীতে নৌকা কমেছে, এটা দিয়ে মাপা যাবে? ইলিশ উৎপাদন কতটা বেড়েছে, প্রকৃত জেলেরা কতটা লাভবান হয়েছেন, আর নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের পরিবার কীভাবে দিন কাটাচ্ছে? এসব প্রশ্নও এখন সামনে আনা জরুরি।
তবে ইলিশ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান অবশ্য আশাব্যঞ্জক। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৫ লাখ ৬৭ হাজার টনে পৌঁছায়। এর পেছনে মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা রক্ষা এবং অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনার ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারায় কিছুটা ভাটা দেখা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টন হলেও পরের অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমেছে। অর্থাৎ শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলেই ইলিশের উৎপাদন প্রতিবছর বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই।
কারণ ইলিশের জীবনচক্রের সঙ্গে নদীর পরিবেশ, নাব্যতা, পানিদূষণ, জাটকা নিধন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বহু বিষয় জড়িত। তাই সংরক্ষণ ব্যবস্থাকেও হতে হবে বহুমাত্রিক।
নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় মূল্য কে দিচ্ছেন?
মা ইলিশ রক্ষার ২২ দিন রাষ্ট্রের জন্য সংরক্ষণকাল হলেও একজন জেলের কাছে এটি আয় বন্ধের সময়। মাছ ধরাই যার একমাত্র পেশা, তার নৌকা যখন ঘাটে বাঁধা থাকে, তখন সংসারের চুলা কিন্তু বন্ধ থাকে না।
চাল, ডাল, তেল, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, নৌকার কিস্তি, মহাজনের দেনা সবই চলতে থাকে। অথচ আয় থাকে না।
সরকারি হিসাবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের ভিজিএফের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সহায়তা কি সব প্রকৃত জেলের কাছে পৌঁছায়? আবার নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য সহায়তা পেলেই কি ২২ দিনের হারানো আয়, ঋণের চাপ এবং নৌকা-জাল রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সামাল দেওয়া সম্ভব?
বাস্তবতা হলো, অনেক জেলে নিষেধাজ্ঞার আগেই ঋণগ্রস্ত থাকেন। মাছ কম পাওয়া, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, নৌকা ও জালের খরচ, সব মিলিয়ে তাদের আর্থিক চাপ বাড়ে। ফলে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন তাদের কাছে শুধু কর্মহীনতার সময় নয়, বরং নতুন করে ঋণের বোঝা তৈরির সময়ও হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে মানসিক সংকট
জেলের জীবনে অনিশ্চয়তা নতুন নয়। কিন্তু যখন জানেন, সামনে কয়েক সপ্তাহ নদীতে যাওয়া যাবে না, অথচ পরিবারের খরচ চলবে, তখন উদ্বেগ বাড়াটাই স্বাভাবিক।
বিশেষ করে যেসব পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জেলে, তাদের জন্য নিষেধাজ্ঞার সময়টি মানসিকভাবে কঠিন। মহাজনের চাপ, ধারদেনা, বাজারের খরচ এবং সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে না পারার হতাশা অনেক পরিবারকে অস্থির করে তুলতে পারে।
তাই মা ইলিশ রক্ষার নীতিতে জেলেদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সামাজিকভাবে কতটা কার্যকর?
মা ইলিশ রক্ষায় মানুষের সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে। প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এ বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু নদীতে টহলের ওপর নয়।
একদিকে যদি একজন ক্ষুদ্র জেলেকে নদীতে নামার অপরাধে আটক করা হয়, অন্যদিকে যদি অবৈধ জাল তৈরি, সরবরাহ ও ইলিশের গোপন বেচাকেনার বড় চক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, তাহলে সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হয়।
তাই প্রকৃত জেলেকে সহায়তা এবং অবৈধ বাণিজ্যিক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দুটিই একসঙ্গে চালাতে হবে।
দরকার তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত
ইলিশ রক্ষার সঙ্গে জেলেকেও রক্ষা করতে হবে
ইলিশ রক্ষার কর্মসূচি নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর সাফল্য কেবল কতটি নৌকা নদীতে নামেনি, কতজন জেলে আটক হয়েছেন কিংবা কত কেজি ইলিশ জব্দ হয়েছে—এসব দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত প্রজননক্ষম মা ইলিশ কতটা নিরাপদে ডিম ছাড়তে পেরেছে? জাটকার সংখ্যা কতটা বেড়েছে? পরবর্তী মৌসুমে ইলিশের প্রাপ্যতা কতটা বেড়েছে? আর একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনে একজন জেলে ও তার পরিবার কতটা নিরাপদে জীবন কাটাতে পেরেছে?
ইলিশ রক্ষার সঙ্গে জেলেকে বাঁচানোর সম্পর্ক সরাসরি। জেলে যদি নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশ সংরক্ষণেও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ দুর্বল হবে।
তাই প্রয়োজন শুধু ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা নয়; প্রয়োজন বছরজুড়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অবৈধ জাল বন্ধ, জাটকা সংরক্ষণ, নদীর পরিবেশ রক্ষা, প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা, পর্যাপ্ত সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান।
তবেই মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি সরকারি অভিযান হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে ইলিশের ভবিষ্যৎ এবং নদীপাড়ের মানুষের জীবিকা রক্ষার একটি টেকসই সামাজিক উদ্যোগ।
রূপক/অরণ্য/ - ০৮.১০.২৬
#Hilsa #Fisheries #Bangladesh